
Relikhola Kalimpong Travel Guide: পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবলেই বাঙালি পর্যটকদের মনে সবার আগে ভেসে ওঠে দার্জিলিং, কালিম্পং, লাভা কিংবা লোলেগাঁওয়ের নাম। তবে এই চেনা চেনা গন্তব্যগুলির চেনা ভিড় এবং কোলাহল এড়িয়ে যদি প্রকৃতির একেবারে নির্জন কোলে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তবে আপনার পছন্দের তালিকায় এবার জুড়ে নিতে পারেন কালিম্পং জেলার এক লুকিয়ে থাকা স্বর্গ যার নাম রেলিখোলা।
সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল, বুনো পাখির ডাক, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ নদী আর মেঘে ঢাকা সকালের মায়াবী রূপ নিয়ে রেলিখোলা এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় অফবিট পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠছে। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে যারা একদম নিরিবিলি পরিবেশে মানসিক শান্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য এই পাহাড়ি গ্রামটি এক্কেবারে আদর্শ জায়গা।
কালিম্পং জেলার একেবারে পূর্ব প্রান্তে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। এই গ্রামের কোল ঘেঁষেই কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে পাহাড়ি রেলি নদী। নদীর মিষ্টি জলতরঙ্গের শব্দ, চারপাশের সবুজের চাদর আর কুয়াশায় মোড়া সকাল এখানকার পরিবেশকে এক লহমায় মোহময়ী করে তোলে। প্রকৃতিপ্রেমী, ছবি তুলতে ভালোবাসেন যারা কিংবা যারা পাখি দেখতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে রেলিখোলা এক স্বর্গরাজ্য।
কীভাবে পৌঁছবেন এই জায়গায়?
কলকাতা থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি কিংবা বিমানে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর সেখান থেকে রেলিখোলার দূরত্ব প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কিলোমিটার। গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছতে সময় লাগবে বড়জোর সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা। এনজেপি বা শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি রিজার্ভ গাড়ির ভাড়া সাধারণত সাড়ে চার হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার কাছাকাছি পড়ে। আর যারা একটু কম খরচে যেতে চান, তারা শেয়ার গাড়িতে প্রথমে কালিম্পং অথবা পেডং পৌঁছে সেখান থেকে লোকাল গাড়ি ভাড়া করে সহজেই রেলিখোলা চলে যেতে পারেন। শিলিগুড়ি থেকেও সরাসরি যাওয়ার জন্য রিজার্ভ গাড়ি বুক করা যায়।
কী কী দেখার সুযোগ মিলবে?
রেলি নদীর তীরে সকাল কিংবা বিকেলে অলস পায়ে হেঁটে বেড়ানোই এখানকার সবচেয়ে বড় পাওনা। নদীর কাঁচের মতো পরিষ্কার জল, বড় বড় পাথরের বোল্ডার আর চারপাশের আদিম প্রকৃতি নিমেষেই মন ভালো করে দেয়। কাছেই রয়েছে রেলি সাসপেনশন ব্রিজ, যার ওপর দাঁড়িয়ে পাহাড়ি নদীর অপরূপ ল্যান্ডস্কেপ ক্যামেরাবন্দী করা যায়।
রেলিখোলাকে কেন্দ্র করে সহজেই ঘুরে নেওয়া যায় ডামসাং ফোর্ট। লেপচা রাজাদের এই ঐতিহাসিক দুর্গ আজও ইতিহাসপ্রেমীদের দারুণ আকর্ষণ করে। এছাড়াও কাছাকাছি রয়েছে ডামসাং ট্রি, টিফিনদারা ভিউ পয়েন্ট, রামধুরা, ইচ্ছেগাঁও, সিলেরিগাঁও, পেডং, লাভা এবং রিশপ। একদিনের সাইটসিয়িংয়ের গাড়ি ভাড়া করে এই জায়গাগুলির বেশ কয়েকটি অনায়াসে দেখে নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ভোরবেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার চোখ জুড়ানো রূপ দেখতে চাইলে টিফিনদারা ভিউ পয়েন্টে যাওয়া মাস্ট। আকাশ পরিষ্কার থাকলে উদীয়মান সূর্যের প্রথম আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই সোনালী রূপ আপনার চোখে দীর্ঘদিন লেগে থাকবে।
অ্যাডভেঞ্চারের দারুণ সুযোগ
রেলিখোলায় এসে শুধু বসে থাকা নয়, চাইলে নদীর ধারে ক্যাম্পিং করে রাত কাটানো, ছোটখাটো ট্রেকিং, বার্ড ওয়াচিং, পাহাড়ি জঙ্গলে নেচার ওয়াক এবং দুর্দান্ত ফটোগ্রাফির আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। বর্ষার ঠিক পরে এবং গোটা শীতকাল জুড়ে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবচেয়ে খোলতাই হয়।
থাকার ব্যবস্থা
রেলিখোলায় পর্যটকদের থাকার জন্য এখন বেশ কয়েকটি চমৎকার হোমস্টে গড়ে উঠেছে। বেশিরভাগ হোমস্টেই স্থানীয় নেপালি পরিবার দ্বারা পরিচালিত, যেখানে পাহাড়ি আতিথেয়তা, সুস্বাদু ঘরোয়া খাবার এবং চমত্কার পরিবেশের স্বাদ পাবেন। জনপ্রিয় থাকার জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম হলো রেলি রিভারসাইড হোমস্টে, রেলিখোলা নেচার হোমস্টে, গ্রিন ভ্যালি হোমস্টে, রিভার ভিউ হোমস্টে এবং কিছু স্থানীয় কটেজ। এর বাইরে পেডং ও রামধুরাতেও ভালো মানের হোটেল এবং হোমস্টে পেয়ে যাবেন।
খরচ কত?
খরচের কথা ধরলে, দুজনের জন্য একটি ভালো হোমস্টের প্রতিদিনের ভাড়া সাধারণত ১৮০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই খরচের মধ্যেই সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর যারা একটু লাক্সারি বা উন্নত মানের কটেজ কিংবা রিসর্টে থাকতে চান, তাদের ক্ষেত্রে খরচ হতে পারে ৩৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলি গাড়ি নিয়ে ঘোরার জন্য ছোট গাড়ির সাইটসিয়িং ভাড়া সাধারণত ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকার মতো পড়ে, যা পুরোপুরি নির্ভর করে আপনি কোন কোন স্পট ঘুরছেন তার ওপর। চার থেকে পাঁচ জন একসঙ্গে দল বেঁধে গেলে এই যাতায়াতের খরচ অনেকটাই ভাগ হয়ে কমে যায়।
ঘোরার আদর্শ সময়
অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস হলো রেলিখোলা ঘুরে আসার সেরা সময়। এই সময়ে পাহাড়ে আকাশ একদম পরিষ্কার থাকে এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে বর্ষাকালে চারপাশ আরও বেশি সবুজ ও সতেজ হয়ে উঠলেও অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি রাস্তায় ধস নেমে যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।
দুদিনের ট্যুর প্ল্যান
ছোট খাটো ছুটির জন্য একটা পারফেক্ট দুদিনের প্ল্যান করে নিতে পারেন। প্রথম দিন শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে রওনা দিয়ে দুপুরের মধ্যে রেলিখোলা পৌঁছে যান। দুপুরের খাওয়া সেরে বিকেলে রেলি নদীর ধারে অলস সময় কাটান এবং সাসপেনশন ব্রিজ ও আশেপাশের গ্রাম ঘুরে দেখুন। দ্বিতীয় দিন সাতসকালে উঠে টিফিনদারা ভিউ পয়েন্ট, ডামসাং ফোর্ট, ডামসাং ট্রি, রামধুরা, ইচ্ছেগাঁও অথবা সিলেরিগাঁওয়ের মতো স্পটগুলি ঘুরে দেখে দুপুরের পর বিকেলের দিকে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিন। কম খরচে পাহাড়ি প্রকৃতির একদম কাছাকাছি শান্তিতে ছুটি কাটাতে চাইলে এবার চেনা দার্জিলিং বাদ দিয়ে ঘুরে আসুন রেলি নদীর তীরের এই রূপকথার দেশে।