
Teesta River Sikkim: সরকারিভাবে বর্ষা ঢুকতে এখনও কিছুটা সময় বাকি। কিন্তু তার আগেই প্রাক-বর্ষার হালকা বৃষ্টিতেই যেভাবে তিস্তা নদী রুদ্ররূপ ধারণ করেছে, তাতে চরম আতঙ্কের প্রহর গুনছেন পাহাড়ি জনপদের মানুষ। সামান্য বৃষ্টিতেই ফুঁসছে পাহাড়ি নদী। এই পরিস্থিতি দেখে বর্ষার মরশুমে কী রূপ হবে, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন মল্লি, রম্ভি কিংবা তিস্তাবাজারের বাসিন্দারা। করোনেশন সেতু মোড় থেকে ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক হয়ে সিকিম যাওয়ার রাস্তায় তিস্তার জল কার্যত সড়ক বরাবর চলে এসেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিগত বছরগুলির মতো এবারও ভরা বর্ষায় দিনের পর দিন বন্ধ হয়ে পড়ে থাকবে সিকিমের লাইফলাইন ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক।
এদিকে, উত্তর সিকিমের পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মিয়ংখোলায় যেভাবে নদী গর্জে উঠছে এবং একের পর এক এলাকায় ধস নামছে, তাতে প্রশাসনের রাতের ঘুম উড়েছে। নতুন করে কি এবারও রাজ্যের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে উত্তর সিকিম? আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে লাচেন ও লাচুংয়ের মতো প্রত্যন্ত জনপদগুলিতে। এমনিতেই বিপর্যয় কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই চালাচ্ছিল উত্তর সিকিম। কিন্তু প্রকৃতির কোপে ফের তা থমকে যাওয়ার জোগাড়। দীর্ঘদিন ধরেই চুংথাং থেকে লাচেন যাওয়ার মূল রাস্তাটি বন্ধ রয়েছে, যার জেরে লাচেনের পর্যটন ব্যবসা কার্যত লাটে উঠেছে। যাঁরা চড়া দামে হোটেল লিজ নিয়ে ব্যবসা করছেন, সেই পর্যটন ব্যবসায়ীদের কপালে এখন চিন্তার চওড়া ভাঁজ। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তার কোনও গ্যারান্টি নেই।
এরই মধ্যে নতুন করে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিয়ংখোলা। এখানকার জলস্ফীতি এতটাই ভয়াবহ আকার নেয় যে, গত শনিবার মংগন ও চুংথাংয়ের মধ্যে সমস্ত রকমের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওইদিনই এলাকা পরিদর্শনে যান মংগনের জেলা শাসক আনন্দ জৈন এবং পুলিশ সুপার এলহি ছেত্রী। তাঁদের কড়া নির্দেশে মংগন ও চুংথাং— দুই প্রান্তেই সুরক্ষাজনিত কারণে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। এরপর রবিবারও মিয়ংখোলায় জলের দাপট কম না থাকায় টুং এবং নাগা দিয়ে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ থাকে। সোমবার বেশ কয়েকটি জায়গায় রাস্তা থেকে ধসের মাটি ও পাথর সরানো হলেও, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জেলা শাসক আনন্দ জৈন জানিয়েছেন, প্রশাসন গোটা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই লাগাতার পথ অবরোধ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে উত্তর সিকিমের পর্যটন শিল্পকে। ভরা গ্রীষ্মের পর্যটন মরশুমে ভালো রোজগারের আশায় বুক বেঁধেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এখন ব্যবসার লাভ তো দূরের কথা, পকেটের লগ্নির টাকা কীভাবে উঠবে, তা ভেবেই দিশেহারা সকলে। এই প্রসঙ্গে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম Développement নেটওয়ার্ক (HHTDN)-এর সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ‘উত্তর সিকিমের বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দ্রুত সড়ক পরিকাঠামোর ভোলবদল বা স্থায়ী উন্নতি না ঘটালে আগামী দিনে হোটেল মালিক থেকে শুরু করে সমস্ত স্তরের পর্যটন ব্যবসায়ীদের বড়সড় মাশুল গুনতে হবে।’
দুর্ভোগের এখানেই শেষ নয়, আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস পাহাড়ের বাসিন্দাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জানা গিয়েছে, পাহাড়ে আগামী কয়েকদিন এই টানা বৃষ্টিপাত চলবে। তার ওপর এবার সিকিম ও উত্তরবঙ্গে নির্ধারিত সময়ের আগেই বর্ষা ঢুকে পড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সিকিমের কেন্দ্রীয় অধিকর্তা গোপীনাথ রাহা জানিয়েছেন, ‘এবার কেরলে বেশ কিছুটা আগেই বর্ষা প্রবেশ করতে চলেছে। সেখানে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু পা রাখার পরেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ঠিক কবে নাগাদ উত্তরবঙ্গে বর্ষার আগমন ঘটবে।’ সব মিলিয়ে ভরা বর্ষার আগেই উত্তর সিকিম এবং তিস্তাপাড়ের বাসিন্দাদের কপালে যে চিন্তার মেঘ জমছে, তা বলাই বাহুল্য।