Advertisement

'কলকাতায় ফিরতে চাই, তৃণমূল এতদিন ফিরতে দেয়নি'

সিপিএমের পর তৃণমূল সরকারও আমাকে রাজ্যে ফিরতে দেয়নি। আমার বইয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে, আমার টেলিভিশন সিরিয়ালের সম্প্রচার আটকে দেওয়া হয়েছে। একজন লেখকের বিরুদ্ধে এই আচরণ কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়; এটি মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রশ্ন করার অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান। যে সমাজ লেখককে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে স্বাধীন চিন্তাকেই ভয় পায়। আমি কলকাতায় ফিরতে চাই। 

তসলিমা নাসরিন।-নিজস্ব ছবিতসলিমা নাসরিন।-নিজস্ব ছবি
Aajtak Bangla
  • কলকাতা,
  • 06 May 2026,
  • अपडेटेड 2:04 PM IST
  • পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন ছিল না; ছিল দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ, ক্লান্তি ও বঞ্চনার বিস্ফোরণ।
  • মানুষ কেবল বিজেপিকে জেতাতে ভোট দেয়নি, তার চেয়েও বেশি তৃণমূলকে হারাতে ভোট দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন ছিল না; ছিল দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভ, ক্লান্তি ও বঞ্চনার বিস্ফোরণ। মানুষ কেবল বিজেপিকে জেতাতে ভোট দেয়নি, তার চেয়েও বেশি তৃণমূলকে হারাতে ভোট দিয়েছে। একসময় যে দল পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দলই বহু মানুষের কাছে ক্ষমতার অহংকার, দুর্নীতি ও দলীয় দখলদারির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ। বিরোধীরা বছরের পর বছর ধরে বলে এসেছে, রাজ্যে মুসলিম তোষণের রাজনীতি মাত্রা ছাড়িয়েছে, প্রশাসন ও পুলিশ ক্রমশ দলীয় যন্ত্রে পরিণত হয়েছে, পঞ্চায়েত থেকে শীর্ষস্তর পর্যন্ত দুর্নীতি ও তোলাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, কাটমানি সংস্কৃতি, স্থানীয় স্তরে নেতাকর্মীদের অস্বাভাবিক আর্থিক উত্থান, এসব সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায়নি। গ্রামের মানুষ দেখেছে, যাদের একসময় কিছুই ছিল না, তারা অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে মানুষের একাংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে প্রকৃত শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বদলে ভাতা-নির্ভর রাজনীতির মাধ্যমে ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা অন্যান্য সামাজিক প্রকল্প বহু মানুষের উপকারে এলেও বিরোধীরা এই প্রচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যে উন্নয়নের বদলে “ভাতা দিয়ে ভোট কেনার” রাজনীতি চলছে।

সরকারি কর্মচারীদের ক্ষোভও কম ছিল না। ডিএ আন্দোলন, চাকরি সংক্রান্ত অসন্তোষ, প্রশাসনের সঙ্গে দূরত্ব, এসব বহু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভোটারকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে ভোটে সন্ত্রাস, বুথ দখল, বিরোধীদের উপর হামলা এবং নির্বাচনকে ঘিরে অরাজকতার অভিযোগ মানুষের মনে গণতন্ত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি করেছে। নারী নিরাপত্তাহীনতা, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও মানুষের ক্ষোভ কম ছিল না। বহু ক্ষেত্রে বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং ক্ষমতাসীনদের অসংবেদনশীল মন্তব্য সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। 

Advertisement

সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের একাংশের মনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর আগের সেই লড়াকু নেত্রী নন। দীর্ঘ ক্ষমতায় থাকার ফলে তাঁর চারপাশে ব্যক্তিপূজা, অতি-কেন্দ্রীকরণ ও ক্ষমতার অহংকারের আবহ তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা সেই ভাবমূর্তিকে আক্রমণ করে “বাংলা আপনাকে আর চায় না”, এই রাজনৈতিক বার্তাকে জনমনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কোনও সরকার কেবল বিরোধীদের শক্তিতে হারে না; হারতে হয় তখনই, যখন জনগণের একাংশ মনে করতে শুরু করে যে ক্ষমতাসীন দল আর তাদের কথা শুনছে না। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে সেই মনস্তত্ত্বই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলা একদিন শুধু একটি ভূখণ্ড ছিল না, ছিল এক বৌদ্ধিক সভ্যতা। বাংলা ছিল চিন্তার রাজধানী, নবজাগরণের কেন্দ্র। রাজা রামমোহন রায় থেকে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষচন্দ্র, সত্যজিৎ রায় থেকে মহাশ্বেতা দেবী, এই ভূখণ্ড মুক্তবুদ্ধি, মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ এবং প্রতিবাদের ঐতিহ্যে নিজেকে নির্মাণ করেছে।

এই বাংলাতেই রামমোহন ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের জন্য সমাজের ঘৃণা ও অপমান বহন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের অন্ধত্বের বিরুদ্ধেও মানবতার পক্ষে কথা বলতে পেরেছিলেন। নজরুল সাম্য ও বিদ্রোহের গান লিখেছিলেন ধর্ম-বর্ণের বিভাজনের বিরুদ্ধে। জীবনানন্দ নিঃসঙ্গ বাংলার সৌন্দর্য আবিষ্কার করেছিলেন, আর সুকান্ত ভট্টাচার্য ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও শোষণহীন এক সাম্যের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এই বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিকরা একসময় ক্ষমতার সামনে মাথা নত করতেন না। তাঁরা ছিলেন সমাজের বিবেক। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশের ‘নাইটহুড’ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিবাদে, নজরুল কারাবরণ করেছেন। প্রশ্ন হলো, আজকের বাংলা কি সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি? নাকি আজকের শিল্পী-সাহিত্যিকদের বড় অংশ ক্ষমতার করতালিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে? বাংলার বহু শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা, কবি ও শিক্ষাবিদকে মানুষ আর স্বাধীন কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখে না; বরং মনে করে, তাঁরা ক্ষমতার আনুকূল্য পাওয়ার জন্য প্রকাশ্যেই শাসকের প্রশংসায় ব্যস্ত।

অবশ্যই ব্যতিক্রম আছেন। কিন্তু জনমানসে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তা হলো, একসময়ের প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক জগৎ আজ অনেকাংশে পোষ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের অনুদান, পুরস্কার, পদ, কমিটি, অনুষ্ঠান, এসবের বিনিময়ে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অর্থ ও সুবিধার কাছে আত্মসমর্পণ করলে শিল্পের স্বাধীনতা নষ্ট হয়, সাহিত্য চাটুকারিতায় পরিণত হয়।

সংখ্যালঘু তোষণের প্রশ্নটিও এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ মনে করেছে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এক ধরনের পক্ষপাতমূলক রাজনীতি চালানো হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করবে; কিন্তু যদি কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে ক্ষোভ জন্মানো অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, জোরপূর্বক দখল এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের খবর নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছেছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দুর মধ্যে মুসলিম মৌলবাদের উত্থান নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক স্বার্থে মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হবে। এই ভয় বাস্তব হোক বা অতিরঞ্জিত, নির্বাচনে তার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলি বিজেপির জয়কে “হিন্দুত্ববাদের জয়” বলে সমালোচনা করছে। কিন্তু এখানেই এক গভীর দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ খ্রিস্টান, ইহুদি বা হিন্দু অধ্যুষিত দেশ নিজেদের সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। অথচ বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম; কোথাও শরিয়া আইন বলবৎ, কোথাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মত্যাগের অধিকার সীমিত, কোথাও সংখ্যালঘুদের অধিকার সংকুচিত। অনেক ইসলামপন্থী গোষ্ঠী নিজেদের দেশে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমর্থন করে, অথচ অন্য দেশে সেকুলারিজম দাবি করে। এই দ্বিমুখী অবস্থান মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণ ও আত্মসমালোচনাকে আরও পিছিয়ে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ যেন এক পুনরাবৃত্ত চক্র। মানুষ একদিন বামফ্রন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, কারণ তাদের মনে হয়েছিল সিপিএম দীর্ঘ শাসনে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিল্পহীনতা, দলতন্ত্র, রাজনৈতিক হিংসা এবং সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগে মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিল। তৃণমূল সেই ক্ষোভের ঢেউয়ে ক্ষমতায় এসেছিল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের চোখে তৃণমূলও সেই একই পথেই হাঁটতে শুরু করে, শুধু আরও প্রকাশ্য, আরও আক্রমণাত্মক, আরও বেপরোয়া রূপে।

Advertisement

আমি নিজেও এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির শিকার। সিপিএম সরকার আমার বই নিষিদ্ধ করেছিল, যে বই ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে এবং সেকুলার মানবতাবাদের পক্ষে লেখা। আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে তৃণমূল সরকারও আমাকে রাজ্যে ফিরতে দেয়নি। আমার বইয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে, আমার টেলিভিশন সিরিয়ালের সম্প্রচার আটকে দেওয়া হয়েছে। একজন লেখকের বিরুদ্ধে এই আচরণ কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়; এটি মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রশ্ন করার অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান। যে সমাজ লেখককে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে স্বাধীন চিন্তাকেই ভয় পায়। আমি কলকাতায় ফিরতে চাই। 

আমি কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মী নই, অন্ধ সমর্থকও নই। আমি মনে করি, কোনও দলই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। যে ভালো কাজ করবে, তাকে ভালো বলতে হবে; যে অন্যায় করবে, তার বিরোধিতা করতে হবে। গণতন্ত্রে নাগরিকের প্রথম দায়িত্ব দলান্ধ না হওয়া, বিবেককে বাঁচিয়ে রাখা।

মানুষ যেহেতু পরিবর্তনের আশায় ভোট দিয়েছে, তাই তাদের প্রত্যাশাও বিশাল। তারা চায় দুর্নীতি কমুক, সন্ত্রাস থামুক, প্রশাসন নিরপেক্ষ হোক, চাকরিতে স্বচ্ছতা আসুক, শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ুক, শিক্ষাব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হোক। তারা চায় পশ্চিমবঙ্গ আবার চিন্তা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হয়ে উঠুক।

কিন্তু শুধু সরকার পাল্টালেই সমাজ পাল্টায় না। সমাজ পাল্টায় যখন মানুষ নিজের ভিতরে পরিবর্তন আনে, যখন শিল্পী বিক্রি হন না, সাংবাদিক ভয় পান না, শিক্ষক দলদাস হন না, লেখক সত্য বলা বন্ধ করেন না। পশ্চিমবঙ্গের সামনে আজ সেই বড় প্রশ্ন, সে কি আবার তার উদার, যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী ঐতিহ্যে ফিরবে, নাকি আরও গভীর মেরুকরণ, ঘৃণা ও প্রতিশোধের রাজনীতির দিকে এগোবে?

বাংলা একদিন ভারতবর্ষকে নবজাগরণের দিশা দিয়েছে, মুক্তচিন্তার সাহস দিয়েছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নতুন ভাষা দিয়েছে। সেই বাংলার কাছে আজও মানুষের প্রত্যাশা অনেক। পরিবর্তনের এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন। না হলে ইতিহাস আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে, আর বাংলার মানুষ বারবার একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকবে।

(অনুলিখন: সুকমল শীল)
 

 

Read more!
Advertisement
Advertisement