Advertisement

'বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্তরণে শেখ হাসিনাই অপরিহার্য'

আজকের প্রজন্মের কাছে ওয়ান-ইলেভেন হয়তো ইতিহাসের একটি অধ্যায়, কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল একটি জীবন্ত বাস্তবতা। আমরা দেখেছি কীভাবে জনগণের ভোটাধিকার, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে একটি অস্বাভাবিক ব্যবস্থার মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

মাহমুদ হাসান রিপনমাহমুদ হাসান রিপন
Aajtak Bangla
  • ঢাকা,
  • 11 Jun 2026,
  • अपडेटेड 3:13 PM IST

১১ জুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আমরা যারা ওয়ান-ইলেভেনের অন্ধকার সময় প্রত্যক্ষ করেছি, রাজপথে আন্দোলন করেছি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অংশ নিয়েছি, তাদের কাছে এই দিনটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর কারামুক্তির দিন নয়, এটি গণতন্ত্রের মুক্তি দিবস। ২০০৮ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৩৩১ দিনের বন্দিজীবন শেষে মুক্তি পান বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর মুক্তির মধ্য দিয়ে পরাজিত হয়েছিল একটি অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্পের যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।

আজকের প্রজন্মের কাছে ওয়ান-ইলেভেন হয়তো ইতিহাসের একটি অধ্যায়, কিন্তু আমাদের কাছে এটি ছিল একটি জীবন্ত বাস্তবতা। আমরা দেখেছি কীভাবে জনগণের ভোটাধিকার, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে একটি অস্বাভাবিক ব্যবস্থার মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর সংবিধান অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার উদ্দেশ্যে এমন একজন ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্যোগ নেয়, যিনি বঙ্গবন্ধুর দুই খুনির আত্মীয় এবং অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আওয়ামী লিগ শুরু থেকেই এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার দাবি জানান। কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লিগসহ গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে এটি ছিল সংবিধানের চেতনা পরিপন্থী পদক্ষেপ। এর ফলে দেশে গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয় এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংকট নিরসনের পরিবর্তে তখনকার নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত পরিস্থিতির মধ্যেই ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে একটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজনের চেষ্টা করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনের উদ্দেশ্যে দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে।

Advertisement

পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতময় হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দেন। এমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সংঘটিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন। সেদিন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে বাধ্য করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠণ করে।

কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রকৃত ক্ষমতা নির্বাচিত বা মনোনীত বেসামরিক প্রশাসনের হাতে নয়; বরং পর্দার আড়াল থেকে সামরিক নেতৃত্বই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করছে। সেনা সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করে দেয় এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষত আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গণগ্রেফতার ও সীমাহীন দমন পীড়ন চালায়। রাজনীতিকে নেতৃত্বশূন্য করার নানা ষড়যন্ত্র চালায় অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া এবং মূল টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে উৎখাত করা। জননেত্রী শেখ হাসিনা তখন শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

শেখ হাসিনার গ্রেফতারির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও গণ আন্দোলন শুরু হয়। আমরা ছাত্র-শিক্ষক-সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শপথ গ্রহণ করি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কারামুক্ত না করে ঘরে ফিরে যাবো না। জননেত্রী শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর তাঁর কারামুক্তি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহ সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখে। সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষক সমিতি কর্তৃক বিবৃতি প্রদান, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ গ্রেপ্তারকৃত রাজনীতিবিদদের মুক্তির যৌক্তিকতা দেশ ও বিদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

আমরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারাদেশের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করি এবং ছাত্র-শিক্ষক সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মৌন মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন সহ বিভিন্ন রকম অহিংস কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। জরুরি অবস্থা ও সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই আন্দোলন দমাতে সেনা সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহু ছাত্র ও শিক্ষককে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করে। কিন্তু আমরা পিছু না হটে তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যাই। চূড়ান্ত পর্যায়ে তীব্র ছাত্র-আন্দোলন ও শিক্ষকদের ঐক্যের মুখে সেই অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতি স্বীকার করে এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

২০০৮ সালের ১১ জুন জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন এবং গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। আমি আজও সেই দিনের আবেগ ভুলতে পারি না। ঐতিহাসিক সেই দিনে শুধু নেত্রীই মুক্তি পাননি; মুক্তি পেয়েছিলো গণতন্ত্রের পুন:প্রতিষ্ঠার পথ। নেত্রীর মুক্তির পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। জনগণের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনমানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন লাভ করে সরকার গঠন করে এবং দেশ আবারো সাংবিধানিক ধারায় ফিরে আসে।

পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

Advertisement

কিন্তু বাংলাদেশ আজ আবারও নানা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট উগ্র মৌলবাদী দেশি-বিদেশি চক্রান্ত ও অপকৌলশের মাধ্যমে ইউনুস গং রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে এদেশকে আবারো পূর্ব পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করেছিল। বিদেশি প্রভূদের সন্তুষ্ট করতে সাজানো গোছানো উন্নয়নশীল একটি রাষ্ট্রকে ধংসস্তুপ বানানোর যে ষড়যন্ত্র তারা চালিয়েছিল তা সফল হয়নি। কারণ এদেশের মুক্তিকামী জনগন এখন বুঝতে পেরেছে লাখো শহীদের রক্তস্নাত প্রিয় মাতৃভূমি আজ গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। মানুষের মৌলিক মানবাধিকার আজ লঙ্ঘিত, স্বাস্থ্যসেবা আজ উপেক্ষিত, জননিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। সারা দেশে আজ বিএনপি-জামায়াতের চাঁদাবাজি, লুটপাট এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে । বিনা চিকিৎসায় ও স্বাস্থ্যখাতের চরম অব্যবস্থাপনায় শত শত শিশু আজ হাম ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারাচ্ছে, এবং নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন পার করছে।  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও গুজব ছড়িয়ে তারা সাময়িকভাবে দেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারলেও, আজ সাধারণ মানুষ তাদের প্রকৃত রূপ বুঝতে পারছে । দেশের মানুষ এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে যে, যেকোনো জাতীয় দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনাই ছিলেন দেশের অদ্বিতীয় 'ক্রাইসিস ম্যানেজার'।  

এমন বাস্তবতায় ওয়ান-ইলেভেনের ইতিহাস আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই, জনগণের বিকল্প জনগণই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০০৭-০৮ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা। উভয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জনগণের ক্ষমতায়ন এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আওয়ামী লীগকে কখনো নিশ্চিহ্ন করা যায় না। আগামীর ডিজিটাল ও স্মার্ট রাজনৈতিক লড়াইয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত নির্দেশনায় এবং আধুনিক ও তরুণ নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারো তৃণমূল থেকে সুসংগঠিত হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে, সাথে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ ।  

একজন গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনরুজ্জীবন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই অপরিহার্য।

Read more!
Advertisement
Advertisement