
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। একটি অঙ্গরাজ্যের ভোটমাত্র। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক। তার কারণ অবশ্যই বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে সজাগ নজর ঢাকার। ঢাকার এই আগ্রহের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তেমন নেই, বরং ফলাফলের প্রভাবই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কাছে পশ্চিমবঙ্গ এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি মিলিত হয় আন্তঃসীমান্ত নদী, অভিবাসন-সংক্রান্ত বিবরণ এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি ও মমতা
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হল জল। তিস্তা নদীর গুরুত্ব বাংলাদেশে অপরিসীম। বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলিতে লাইফ লাইন বলা চলে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭.৩ শতাংশ তিস্তার জলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি এখনও অধরা। ২০১১ সালে হতে হতেও হয়নি। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চুক্তি প্রায় ফাইনাল করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু বেঁকে বসেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০১৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা সফর এবং একই বছরে পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর পুনরায় সফর, প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল বটে, কিন্তু কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর ফল হয়েছে আশাবাদ ও হতাশার এক পুনরাবৃত্ত চক্র, যা ঢাকার মধ্যে একটি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা বাস্তব ফলের নিশ্চয়তা দেয় না। তবে রাজনৈতিক বার্তা বা ইঙ্গিতের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উষ্ণতা বজায় থেকেছে। ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়ের পর, বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ঘনিষ্ঠ ও আন্তরিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন এবং আরও গভীর সহযোগিতার আশা প্রকাশ করেন। কিন্তু তা মূল বিষয়গুলিতে কোনও অগ্রগতিতে রূপান্তরিত হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনসংখ্যা ও সীমান্ত
জল ছাড়াও, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়হল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মুসলিম, এবং তারা ভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃণমূলের আমলে অভিবাসন ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলিতে তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষা দেখা যায়। তবে এই সংযম তিস্তার মতো মূল ইস্যুগুলিতে কোনও অগ্রগতিতে পরিণত হয়নি। তৃণমূলের নির্বাচনী ইশতেহারেও বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তাই দেওয়া হয়েছে। বিজেপি যখন বারবার অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করছে, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের কথা বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমাগত বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই গোটা বিষয় কিন্তু নজর রাখছে ঢাকাও।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ঢাকার নজর কেন?
ভারতের পূর্ব সীমান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-স্তরের রাজনীতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ঢাকা সংযোগ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক একীকরণকে ভিত্তি করে দিল্লির সঙ্গে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করেছে। তবুও তিস্তা-সংক্রান্ত অচলাবস্থা এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে বারবার সংবেদনশীলতা দেখায়, এই সম্পর্ক উপ-জাতীয় রাজনৈতিক গতিশীলতার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।
এই নির্বাচনের ফলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বিরাট কিছু বদল হবে না ঠিকই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থান তিস্তা জলবণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি নতুন সরকার সীমান্ত-পার সহযোগিতায় বেশি আগ্রহী হয়, তাহলে আটকে থাকা আলোচনা এগোতে পারে, আর যদি বর্তমান ধারা বজায় থাকে, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে ধীর অগ্রগতি ও অন্য ক্ষেত্রে অচলাবস্থা চলবে।