তালিবান শাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতময় বর্তমান আফগানিস্তান দেখে বিশ্বাস করা কঠিন। এই দেশ একসময় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে মুক্ত, শান্ত ও আধুনিক সমাজগুলোর একটি। ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকের ছবিতে ধরা পড়ে অন্য এক আফগানিস্তান, যেখানে ছিল স্বাধীন চলাফেরা, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া, মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত সামাজিকতা।
সেই সময় আফগান সমাজে ছিল উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিস্বাধীনতা। স্কুলে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ত, শিক্ষকদের সঙ্গে সাধারণ পরিবেশে ছবি তুলত। ক্লাস শেষে মেয়ে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে বাড়ি ফিরত। যা আজকের দিনে তালিবান আইন অনুযায়ী কল্পনাতীত। রাস্তাঘাটে মেয়েদের চলাচল বা পোশাক নিয়ে কোনও কড়া নিয়ম ছিল না।
এই ছবি তুলেছিলেন মার্কিন অধ্যাপক উইলিয়াম পোডলিচ। ১৯৬৭ সালে ইউনেস্কোর দায়িত্ব নিয়ে তিনি ও তাঁর পরিবার কাবুলে কিছুদিন থাকেন। সে সময় তাঁর দুই মেয়ে পেগ এবং জান। পড়ত আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। প্রায় ২৫০ ছাত্রছাত্রীর ওই স্কুলে ১৯৬৭-৬৮ সালে ১৮ জন গ্র্যাজুয়েটও হয়। পোডলিচের ছবিতে দেখা যায় শিক্ষিকা-ছাত্রীর পাশে শাড়ি পরা মহিলারাও। এক সম্প্রীতিময় সাংস্কৃতিক পরিবেশ।
পেগ পোডলিচ পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, আফগানিস্তান তাদের কাছে ছিল শান্ত, অতিথিপরায়ণ ও নিরাপদ একটি দেশ। স্থানীয় মানুষ ছিল বন্ধুভাবাপন্ন। তাঁর বেড়ে ওঠা অ্যারিজোনার পরিবেশের চেয়ে ভিন্ন হলেও সেই সময়কার কাবুলে এক ধরনের মানবিক সরলতা ছিল। জন পোডলিচের ছবিতে দেখা যায়, তিনি নির্ভয়ে ইস্তালিফ গ্রামের বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সেই সময়ে পরিবারসহ আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বাসে ভ্রমণ করতেন পেগ, সানগ্লাস পরে ছবি তুলেছিলেন দীর্ঘ পথের সফরে। এক বিদেশি মহিলাকে দেখা যায় পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে থাকতে। যা প্রমাণ করে সামাজিক মেলামেশা তখন কতটাই না সহজ ছিল। আঞ্চলিক ভ্রমণও ছিল নিরাপদ।
কিন্তু ছবির সেই উন্মুক্ত আফগানিস্তান আজ প্রায় অচেনা। ১৯৯৪ সালে কান্দাহার থেকে উদ্ভব হয় তালিবান গোষ্ঠীর, সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদিনদের ঘাঁটি থেকেই। মার্কিন সহায়তায় শক্তিশালী হয়ে ১৯৯৬ সালে তারা দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপরই শুরু হয় কঠোর শরিয়তি শাসন, মহিলাদের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ। একসময় যে দেশ নারীর স্বাধীন উপস্থিতিতে ভরপুর ছিল, আজ তা অতীতের ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।