বিশ্ব উষ্ণায়নের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাচ্ছে না পৃথিবী। নাসার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য। জানা গিয়েছে, গত ১১ বছর ধরে পৃথিবী তার শক্তির ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। সূর্য থেকে আসা তাপ এবং পৃথিবী থেকে ফিরে যাওয়া তাপের মধ্যে যে সামঞ্জস্য থাকার কথা ছিল, তাতে বড়সড় ফাটল ধরেছে। ফলে সৌরশক্তির একটি বড় অংশ মহাকাশে ফিরে না গিয়ে বায়ুমণ্ডলেই আটকে থাকছে, যা ক্রমাগত পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলেছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ‘আর্থ এনার্জি ইমব্যালেন্স’ বা শক্তির ভারসাম্যহীনতার প্রধান কারণ হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত নিঃসরণ। কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্যাসগুলি চাদরের মতো পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে, যা তাপকে বের হতে বাধা দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া থেকে শুরু করে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ওপর। বিগত এক দশকে এই প্রক্রিয়া অভাবনীয় দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে।
তালিকায় সবথেকে ভয়ঙ্কর বিষয়টি হলো বনাঞ্চলে লাগাতার অগ্নিকাণ্ড বা দাবানল। গত কয়েক বছরে আমাজন থেকে অস্ট্রেলিয়া, বিশ্বের ফুসফুস বলে পরিচিত বনাঞ্চলগুলি বারবার পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন অক্সিজেন তৈরির কারখানা ধ্বংস হচ্ছে, তেমনই কোটি কোটি টন বিষাক্ত ধোঁয়া ও কার্বন বায়ুমণ্ডলে মিশছে। অরণ্য বিনাশের ফলে মাটি ও বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা কমে গিয়ে পৃথিবীকে আরও শুষ্ক ও উত্তপ্ত করে তুলছে।
গবেষকদের দাবি, এই ১১ বছরের চক্রে পৃথিবীর মহাসাগরগুলি সবথেকে বেশি তাপ শোষণ করেছে। সমুদ্রের উপরিভাগের জলস্তর অস্বাভাবিক গরম হয়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কোরাল রিফ বা প্রবাল প্রাচীরগুলি সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক মৎস্য সম্পদের ওপর। সমুদ্রের এই তাপ শোষণ ক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্কেত দিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ভারসাম্যহীনতার কারণেই বিশ্বজুড়ে ঋতুচক্রের আমূল পরিবর্তন ঘটছে। অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা ভয়াবহ সাইক্লোন, সবই এই শক্তির অপচয় বা আটকে থাকার ফল। ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে গরমের তীব্রতা প্রতি বছর রেকর্ড ভাঙছে। আর্দ্রতা ও তাপের এই সংমিশ্রণ জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যা মোকাবিলা করা প্রশাসনের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০২৬-এর এই সময়ে দাঁড়িয়ে নাসার উপগ্রহ চিত্রগুলি বলছে, বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে তাপ ধরে রাখার প্রবণতা আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি লক্ষ্য করেছে যে, সূর্য থেকে আসা শর্ট-ওয়েভ রেডিয়েশন যত সহজে প্রবেশ করছে, পৃথিবী থেকে ইনফ্রারেড রেডিয়েশন তত সহজে বেরোতে পারছে না। এই বৈষম্যই আধুনিক বিজ্ঞানের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় একাধিক চুক্তি করলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ কাটার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘রেডিয়েটিভ ফোর্সিং’, যা এখন বিপদসীমার ওপরে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈপ্লবিক কোনও পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই ভারসাম্যহীনতা ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। আগামী কয়েক দশকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতে চাষাবাদ ও পানীয় জলের উৎসগুলি শুকিয়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। প্রকৃতির এই প্রতিশোধ রুখতে একক চেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন বেশি।
নাসার বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাকে মানবজাতির জন্য একটি ‘অন্তিম সতর্কবার্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ১১ বছরের এই পরিসংখ্যান স্রেফ সংখ্যা নয়, বরং এটি পৃথিবীর অসুস্থতার একটি মেডিকেল রিপোর্ট। সবুজায়ন ও দূষণমুক্ত শক্তির দিকে অবিলম্বে না ফিরলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এই নীল গ্রহ এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে। এখন দেখার, বিশ্বনেতারা এই বৈজ্ঞানিক সতর্কবাণীকে কতটা গুরুত্ব দেন।