
দুই মহান ব্যক্তিত্ব। একজন বেছে নিয়েছিলেন সত্য ও অহিংসার পথ। অন্যজন ব্রতী ছিলেন মানবসেবা, কর্ম ও জ্ঞানযোগে। দু'জনেই ভারতকে অন্তরের শক্তি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। একজন বেদান্ত ও ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার বাণী পাশ্চাত্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন, অন্যজন সত্য ও অহিংসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা ভিন্ন যুগের ছিলেন না। বরং একই যুগের দু'টি বলিষ্ট কণ্ঠস্বর ছিলেন। যাঁরা ভারতের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এক প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। অথচ কখনও সামনাসামনি দেখা হয়নি মহাত্মা গান্ধী ও স্বামী বিবেকানন্দের।
তাঁদের জন্মের মধ্যে মাত্র ৬ বছরের ব্যবধান ছিল। স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ১৮৬৩ সালে আর মহাত্মা গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালে। তবে তাঁদের কর্মক্ষেত্র ও কর্মপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিবেকানন্দ বিশ্বের সামনে ভারতীয় দর্শন ও বেদান্তকে তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে, গান্ধী সত্য, অহিংসা এবং গণঅংশগ্রহণকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
তবুও তাঁদের চিন্তাধারার মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র ছিল। আধ্যাত্মিরতা ও মানবসেবা।
বিবেকানন্দের কাছে ধর্ম কেবল উপাসনার বা দর্শনের বিষয় ছিল না। তিনি একে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি দরিদ্র ও দুঃখী মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখার উপর জোর দিয়েছিলেন। গান্ধীর কাছে মানবসেবা ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর কাছএ রাজনীতি কেবল ক্ষমতা লাভের উপায় ছিল না। বরং সমাজ ও ব্যক্তির নৈতিক উন্নতির পথ ছিল।
১৯০১ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে যোগ দিতে গান্ধীজি কলকাতায় এসেছিলেন। সেই সময়ে গান্ধীজি জাতীয় রাজনীতিতে ততটাই প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁর সংগ্রামও ভারতে তেমন পরিচিত ছিল না সে সময়ে। কিন্তু বিবেকানন্দের খ্যাতি ততদিনে দেশ ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। শিকাগোতে তাঁর বিখ্যাত ভাষণটি ১৮৯৩ সালেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।
কলকাতায় থাকাকালীন গান্ধী স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা করার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। তিনি তাঁর চিন্তাভাবনা এবং আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা আরও নিবিড় ভাবে বুঝতে চেয়েছিলেন। গান্ধী পরবর্তীকালে তাঁর আত্মজীবনী 'মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ'-এ এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে এই সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি।
মহাত্মা গান্ধী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, 'যেহেতু আমি কলকাতায় ছিলাম, ওখানকার জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে কৌতুহল হয়েছিল। আমি প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পর্কে অনেক কিছু বোঝার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে কলকাতায় এসে চলে যাওয়াটা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। একদিন তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আমি খুব ভোরে বেলুড় মঠের উদ্দেশে রওনা হলাম। আমি পায়ে হেঁটেই যাত্রা শুরু করেছিলাম।'
বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ এতটাই প্রবল ছিল তিনি প্রায় ৩.২ কিমি হেঁটে মঠে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি হতাশ হন কারণ স্বামীজি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। স্বামীজি তখন অসুস্থ ছিলেন। কারও সঙ্গে দেখা করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। এর কয়েকমাস পরেই ১৯০২ সালের জুলাই মাসে স্বামী বিবেকানন্দ মারা যান।
পরবর্তীকালে গান্ধী বিবেকানন্দের চিন্তাধারার সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেছিলেন। ১৯২১ সালে বিবেকানন্দ জয়ন্তী উপলক্ষে গান্ধীজি যখন বেলুড় মঠে গিয়েছিলেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'স্বামীজির রচনাবলী পড়ে আমার দেশের প্রতি ভালোবাসা হাজারগুণ বেড়ে গিয়েছে।'
তাঁদের দু'জনের কখনও মুখোমুখি দেখা হয়নি কিন্তু ভারতীয় ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের ভাব বিনিময় অব্যাহত ছিল। এই অসম্পূর্ণ সাক্ষাতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাহিনি এটাই। এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের কখনও দেখা হয়নি। কিন্তু ভারতকে জাগিয়ে তোলার তাঁদের প্রচেষ্টা ইতিহাসে জড়িয়ে গিয়েছে। এই দুই মহান ব্যক্তি পাশ্চাত্যে বিশ্বের কাছে ভারতের আধ্যাত্মিক শক্তি তুলে ধরেছিলেন এবং ভারতীয় জনগণকে তাঁদের নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করতে শিখিয়েছিলেন।