
কলকাতার পুজো ঘিরে যেমন উন্মাদনা থাকে, ঠিক তেমনই যাঁরা এই শহর থেকে দূরে থাকেন তাঁদেরও পুজো ঘিরে সেই উন্মাদনা যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মুম্বইয়ের দুর্গাপুজো যেন প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে অন্য ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি করে। এই মায়ানগরীতে তারকাদের পুজো যতটা জনপ্রিয়, তার চেয়ে কোনও অংশে কম জনপ্রিয় নয় বান্দ্রা এলাকার এই পুজোটি। যেটি লিঙ্কিং রোডের ন্যাশনাল কলেজের উল্টোদিকে হয়। নতুনপল্লী সাবর্জনীন দুর্গোৎসব কমিটি, যেটি বান্দ্রা দুর্গা পুজো নামেও পরিচিত, এবছর ৫৪ বছরে পা দিল।
বান্দ্রা দুর্গাপুজোর যুগ্ম সম্পাদক নবকুমার দাস বলেন যে ১৯৭২ সালে মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে এই পুজোর সূচনা হয়। এই পুজোর সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিলেন আরাধনা, অমানুষ খ্যাত পরিচালক শক্তি সামন্ত, বাসু চট্টোপাধ্যায়, বাপি লাহিড়ি, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো তারকারা। তবে গত ৪ বছরে এই পুজোতে কিছুটা বদল এসেছে। এতদিন এই পুজো হত একেবারে পাড়ার পুজোর মতোই। কিন্তু গত চার বছর ধরে থিমপুজো হচ্ছে নতুনপল্লী সাবর্জনীন পুজোতে। নবকুমার দাস বলেন, 'গত ৪ বছর ধরে মুম্বইয়ের এই পুজো থিমের দিকে ঘেঁষেছে। আগে এই পুজোতে থিমের ছোঁয়া ছিল না। ৫০ বছরের পূর্তিতে করা হয়েছিল হাউজ অফ ফ্লাওয়ার্স, ৫১ বছরে করা হয়েছিল একটা গণেশ মন্দিরের আদলে মণ্ডপ, শেষ বছরে যেটা করেছিলাম, গোটা মুম্বইতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ২০২৫-এর থিম ছিল, বাঙালি মেয়েরা লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে, সেটাকে মাথায় রেখে ওই কম্বিনেশনের ঢাকাই শাড়ি দিয়ে মণ্ডপ।'
নবকুমার দাস বলেন, 'এই বছরও থিম রয়েছে। এবারে মণ্ডপের শুরু হবে শিবের ত্রিশূল দিয়ে, সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে গিয়ে দেখা যাবে দুর্গাপ্রতিমাকে। এই টানেলটার নাম হল শিবা টু শক্তি। প্রতিমা হচ্ছে সাবেকি সাজ তবে থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। প্রতিমার আদলে ফুটে উঠবে সাধারণ মেয়ের মুখ, সঙ্গে সাবেকিয়ানা গোল্ডেন সাজ। আর পুজোর মণ্ডপ তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে মাদুর, পাটের দড়ি, বাঁশ। গোটা মণ্ডপেই থাকবে থিমকে মাথায় রেখে কারুকার্য।'
চমক রয়েছে বান্দ্রার এই পুজোয়। এই বছর দুদিন সপ্তমী হলেও মুম্বইয়ের এই পুজোতে অষ্টমী কিন্তু দুদিন জানালেন নবকুমার দাস। যুগ্ম সম্পাদক বলেন, 'গত ৫৪ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এই পুজোতে কলকাতা থেকে ২ জন পুরোহিত ও চারজন ঢাকি আসেন। এছাড়াও এই পুজোতে প্রতিবছর আসেন সুস্মিতা সেন, এখানে অষ্টমীর অঞ্জলি, সন্ধিপুজোতে অংশ নেন তিনি। বিপাশা বসুও আসেন স্বামী করণকে নিয়ে। পুজোর মূল আকর্ষণ হল চারদিনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় এখানে, সপ্তমীতে শুধু এই দুর্গোৎসব কমিটির লোকেরা মিলে নাটক করেন।'
মুম্বই পুজোর প্রধান ইউএসপি হল ভোগ। প্রবাসী বাঙালিরা এই পুজোর সময় ভোগ খাওয়ার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। বান্দ্রার এই পুজোতে ভোগের মেনুতে থাকে খিচুড়ি, লাবড়া, এক একদিন আলু ফুলকপির তরকারি হয়, থাকে পায়েস, মিষ্টি, চাটনি ও পাঁপড়, বেগুনি। একেবারে বাঙালির প্রিয় ভোগ এখানে পরিবেশন করা হয়। নবকুমার দাস বলেন, পুজোর চারদিনই সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষকে এই ভোগ দেওয়া হয়। তবে বাঙালি নয়, সব ধর্মের মানুষই এখানে ভিড় জমায় পুজো দেখতে ও ভোগ খেতে। এখানকার ভোগ Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI) দ্বারা সার্টিফায়েড।
এই পুজোতে প্রবাসী বাঙালিদের যোগদান হয় দেখার মতো। আসলে এই পুজোর কমিটির সদস্যরা বান্দ্রা, খার আর সান্তাক্রুজের বাসিন্দা। আর তাই এইসব এলাকা থেকে প্রবাসী বাঙালিরা পুজোতে যোগদান করেন। নিজের শহর থেকে দূরে থেকেও বান্দ্রার এই পুজো বাঙালির সেই শারদোৎসবকে ফিরিয়ে আনে। পুজোর চারদিনই মণ্ডপে থাকে ভিড়।