
পার্ক স্ট্রিটের (Park Street) পার্শ্ববর্তী বর্তমান অবস্থিত 'সেন্ট জেভিয়ার্স' (St.Xavier's College) কলেজের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে অগ্নিকাণ্ডের রোমহর্ষক ইতিহাস। এই ইতিহাস অনেকেরই অজানা। 'সেন্ট জেভিয়ার্স' কলেজ-এর এই বাড়িটাই আগে ছিল 'Sans Souci' থিয়েটার, বাংলায় লিখলে দাঁড়ায় 'সাঁ-সুশি'। কলেজের প্রবেশপথে থাকা বড়বড় ওই সিঁড়িগুলি ছিল 'সাঁ-সুশি' থিয়েটারের সিঁড়ি। গা ছমছমে ঘটনাটি ঘটে এই থিয়েটারের এক অভিনেত্রীকে ঘিরে। লেখক হরিসাধন মুখোপাধ্যায় তাঁর 'কলিকাতা সেকালের ও একালের' বইটিতে তুলে ধরেছেন ভয়াবহ আগুন লাগার সেই কাহিনী।
'সাঁ-সুশি' থিয়েটার কীভাবে প্রতিষ্ঠা হল?
তথ্য অনুযায়ী, মিসেস এস্থার লিচ নামের এক নামজাদা ইংরেজ অভিনেত্রী এই থিয়েটারে অভিনয় করতেন। ১৮৩৯ সালে থিয়েটার রোডের পূর্বকথিত থিয়েটারটি আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে গেলে পার্ক স্ট্রিটে এই 'সাঁ-সুশি' থিয়েটার চালু করা হয়। তৎকালীন ইংলিশম্যান পত্রিকার সম্পাদক স্টকেলার সাহেব মিসেস এস্থার লিচকে সামনে রেখে এই থিয়েটারটি চালু করার চেষ্টা করেন। এর জন্য সংগ্রহ করা হয় চাঁদাও। এমনটাও জানা যায়, ভারতবর্ষের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড অকুল্যান্ড এই থিয়েটারের জন্য এক হাজার টাকা চাঁদা দেন। পুরোদমে থিয়েটারের কাজ চালু হয়ে যায়। অবশেষে ১৮৪০ সালে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। ১৮৪১ সাল থেকে রমরমিয়ে চালু হয় থিয়েটার। সাহেব, বাবুদের আনাগোনা।
তেলের বাতি থেকে অগ্নিদগ্ধ হন অভিনেত্রী, কীকরে?
অভিনয়ের প্রথম রাতে গভর্নর জেনারেল স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। এস্থার লিচ এক রাতে অভিনয়ে মঞ্চে নামার আগে 'উইংস', যাকে বলে ব্যাক স্টেজ, সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। সেসময় কলকাতা শহরে ছিল না কেরোসিন ল্যাম্প বা গ্যাসের আলোর প্রচলন। সেখানে তেলের বাতি জ্বলছিল। বাতির সেই আলোতে লিচের পোশাকে আগুন ধরে যায়। প্রাণ বাঁচাতে স্টেজের মধ্যে ঢুকে আসেন লিচ। অগ্নিদগদ্ধ অভিনেত্রীকে দেখে বিচলিত হয়ে ওঠেন দর্শকমণ্ডলী। প্রাণভয়ে সকলেই এদিক ওদিক ছুটতে থাকেন। লিচের সারা শরীর ভয়ঙ্করভাবে পুড়ে যায়। দুর্ঘটনার দু'দিন পর মৃত্যু হয় অভিনেত্রীর। এর পর 'সাঁ-সুশি' থিয়েটারটি এক ফ্রেঞ্চ কোম্পানি ভাড়া নিয়ে নেয়। তারপর চিরতরে উঠে যায় 'সাঁ-সুশি' থিয়েটার।
এর অনেক পরে ১৮৬০ সালে ফ্রান্সিস জেভিয়ারের নামে কলেজটি স্থাপিত হয়। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ড. হেনরি ডেপেলচিন এসজে। সেবছরই নিজের তদারকিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেন।
পুরনো কলেবরে 'সাঁ-সুশি'-র নতুন এই রূপ এখন কলকাতার অন্যতম নামজাদা কলেজে পরিণত হয়েছে। পার্ক স্ট্রিটের মতো ব্যস্ততম এলাকায় ইংরেজি মাধ্যমের এই 'সেন্ট জেভিয়ার্স' কলেজ বিশ্বজুড়ে সুবিদিত। তবে লিচের এই ভয়াবহ মৃত্যু কাহিনী শুনলে গা শিউরে ওঠে বৈকি।