
সুন্দরবন। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল আর নদী-খাঁড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা। কিন্তু সুন্দরবনের পরিচয় এখন শুধু জঙ্গল বা পর্যটনে আটকে নেই। মধু, চাল, ডাল থেকে ঘি, সর্ষের তেল থেকে নানা হস্তশিল্প- সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার সঙ্গে যুক্ত একাধিক পণ্য এখন কলকাতা-সহ পশ্চিবঙ্গের নানা শহরের বাজারে পাওয়া যায়। এমনকী অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও পৌঁছে যাচ্ছে সেই সব পণ্য। কিন্তু কোনও প্যাকেটে 'Sundarban' লেখা থাকলেই কি সেটি সত্যিই সুন্দরবনের পণ্য? নাকি ক্ষেত্রে সুন্দরবনের নামটি শুধু পরিচয় বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে!
সুন্দরবনের পণ্য বলে যেগুলি বাজারে বিক্রি হয় তার মধ্যে সবথেকে বেশি পরিচিত মধু। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল থেকে মৌয়ালদের সংগ্রহ করা বন্য মধু বাজারে বিক্রি হয়। আর এর চাহিদার পিছনে রয়েছে GI (Geographical Indication) স্বীকৃতি। ২০২৪ সালে সুন্দরবনের মধু এই স্বীকৃতি পায়।
'সুন্দরবনের পণ্য' বলে বাজারে বিক্রি হলেও সব কিন্তু সুন্দরবনের নয়
সুন্দরবনের মধু : সুন্দরবনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে পণ্যটির নাম জড়িয়ে, তা হল মধু। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল থেকে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করেন বলে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই বন্য মধুই 'Sundarban Honey' নামে পরিচিত। ২০২৪ সালে 'Sundarban Honey' GI স্বীকৃতি পাওয়ায় এই পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয় সরকারি ভাবে স্বীকৃত। সেই মধু বিভিন্ন নামে কলকাতার বাজারে আসে। আবার অনলাইনেও বিক্রি হয়। তাই সুন্দরবনের মধু এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি দেয়।
গোবিন্দভোগ চাল : সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের তালিকায় গোবিন্দভোগ চালের নামও পাওয়া যায়। কিছু বাজারজাত উদ্যোগে এই চালকে সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে বিক্রি করা হয়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গোবিন্দভোগ চালকে 'সুন্দরবনের GI পণ্য' বলা যাবে না। তাই প্যাকেটে সুন্দরবনের উল্লেখ থাকলে তার উৎপাদনস্থল ও উৎসের তথ্য দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
রাধাতিলক চাল : রাধাতিলক চালকেও সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত স্থানীয় ধানের একটি জাত হিসেবে দাবি করে থাকে কিছু ব্যবসায়ী সংস্থা। তবে এই চাল যে শুধুমাত্র সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকাতেই উৎপাদিত হয়, এমনটা নয়। চাল ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, প্যাকেটে সুন্দরবন লেখা থাকলেই সেই চাল যে কেবল ওই অঞ্চল থেকেই এসেছে এমন দাবি করা যায় না। সেক্ষেত্রে কেনার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সোনা মুগ ডাল : চালের মতো সুন্দরবন এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মধ্যে সোনা মুগ ডালের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিছু উদ্যোগে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত মুগ ডাল বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাজারে পাওয়া প্রতিটি সোনা মুগ ডাল যে সুন্দরবনের উৎপাদন, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
ব্রাউন রাইস : সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য হিসেবে ব্রাউন রাইসের কথাও বিভিন্ন বিপণন উদ্যোগে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে এর সঙ্গে সুন্দরবন এলাকার কৃষি উৎপাদনের যোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু প্রতিটি 'Sundarban Brown Rice' একই এলাকা থেকে আসে- এমন নিশ্চিত তথ্য সরকারিভাবে পাওয়া যায় না। ।
ঘি : সুন্দরবন এলাকার কৃষক পরিবার বা স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত দুধ থেকে ঘি তৈরির কথাও কিছু ক্ষেত্রে বলা হয়। সেই ধরনের ঘি বাজারে সুন্দরবন-সংযুক্ত পণ্য হিসেবে বিক্রি হতে পারে। তবে বাজারে থাকা প্রতিটি ঘির ক্ষেত্রেই দুধের উৎস সুন্দরবন, এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
সর্ষের তেল : সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত সর্ষে বা স্থানীয় কৃষির সঙ্গে যুক্ত সর্ষের তেল বাজারে পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন উদ্যোগে উল্লেখ করা হয়। কোথাও কাঠের ঘানিতে তৈরি তেলের কথাও বলা হয়। কিন্তু শুধু ‘Sundarban’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেই তেলের সর্ষে সুন্দরবন থেকে এসেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
গুড় : সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গুড় তৈরির যোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন স্থানীয় উদ্যোগে দাবি করা হয়। সেই সূত্রে সুন্দরবন-সংযুক্ত গুড়ও বাজারে পাওয়া যায়। তবে প্রতিটি গুড়ের উৎস সুন্দরবন, এমন কোনও সাধারণীকরণ করা যাবে না।
দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য : সুন্দরবন এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে দুধ উৎপাদনের যোগ রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদকদের দুধ থেকে দই, ছানা, মাখন, ঘি বা অন্য দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির উদ্যোগও রয়েছে বলে জানা যায়। তবে এই পণ্যগুলির ক্ষেত্রে সরবরাহের এলাকা, দুধের উৎস এবং প্রক্রিয়াকরণের জায়গা এক নয় হতে পারে। তাই সব দুগ্ধজাত পণ্যকে সরাসরি 'সুন্দরবনের পণ্য' বলা ঠিক হবে না।
সুন্দরবনের পটচিত্র ও হস্তশিল্প : সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার কারিগর, বিশেষ করে মহিলা শিল্পীদের তৈরি পটচিত্র ও হস্তশিল্পের কথা একাধিক উদ্যোগে উঠে এসেছে। ঝড়খালি-সহ বিভিন্ন এলাকায় পটচিত্র, মাটির সামগ্রী, হাতপাখা, লণ্ঠন, ব্যাগ, পোশাক ও নানা ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব সামগ্রী সুন্দরবনের শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হলেও প্রতিটি পণ্য যে সুন্দরবনের কোনও নির্দিষ্ট গ্রামেই তৈরি, এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
তাহলে কোনটা সত্যিই সুন্দরবনের?
'সুন্দরবনের পণ্য' কথাটির অর্থ সব ক্ষেত্রে এক নয়। কোনও পণ্য সরাসরি সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা হতে পারে। কোনওটি আবার সুন্দরবন এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত। কোনও পণ্যের সঙ্গে সুন্দরবনের যোগ থাকতে পারে স্থানীয় কারিগর বা উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে। আবার কোথাও সুন্দরবনের নাম শুধুই বাজারজাত করার পরিচয় হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
এক্ষেত্রে সুন্দরবনের মধুর অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট। কারণ 'Sundarban Honey' GI স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে এই পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয়ের সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে। অন্যদিকে চাল, ডাল, ঘি, সর্ষের তেল, গুড় বা হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে সুন্দরবনের সঙ্গে যোগ থাকার দাবি থাকলেও প্রতিটি পণ্যের জন্য একই ধরনের ভৌগোলিক স্বীকৃতি রয়েছে, এমনটা বলা যাবে না।
তাই বাজারে কোনও পণ্যের গায়ে 'Sundarban' লেখা দেখলেই সেটিকে সুন্দরবনের নিজস্ব পণ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। পণ্যের উৎপাদনস্থল, কাঁচামালের উৎস, উৎপাদক এবং প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট তথ্য দেখা জরুরি।