
Asian Games 2026: কিছু কিছু ফাইনালের আগে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হয়, ম্যাচটা যেন শুরু হওয়ার আগেই তার গল্পটা লেখা হয়ে গিয়েছে। শুধু অপেক্ষা থাকে, সেই গল্পের শেষ দৃশ্যটা কখন সামনে আসে।
নাগোয়ার রাতেও বোধহয় তেমনই কিছু হল।
এক দিকে স্মৃতি মন্ধানা। অন্য দিকে শেফালি বর্মা। পরে রিচা ঘোষ। আর বল হাতে দীপ্তি শর্মা। ভারতীয় ক্রিকেটের চার ঘরের মেয়ে যেন একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। ফলে ফাইনালটা আর ফাইনাল রইল না। এ যেন ভারতের মহিলা টিমের ক্রিকেট শৈলী বিশ্বের কাছে তুলে ধরার মঞ্চ।
এশিয়ান গেমসের মহিলা ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানে হারিয়ে সোনা পেল ভারত। পেল নয়, বরং ধরে রাখল বলাই ভাল। প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৩ উইকেটে ২১৬ রান। জবাবে শ্রীলঙ্কা ১৫.৪ ওভারে অলআউট ৬৯। ব্যবধানটাই বলে দিচ্ছে এই মহারণের গল্প ঠিক কতটা একপেশে ছিল।
আর একটা বিষয় মনে রাখার মতো। ২০২৬ এশিয়ান গেমসে এটাই ভারতের প্রথম সোনা।
আর সেই সোনা আনলেন দেশের সোনার মেয়েরাই।
ফাইনালের সকালে ২০২৩-এর স্মৃতি
অনেক সময় দেখা যায়, প্রথমবার কোনও ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মনে হচ্ছে এ যেন আগেও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিকে 'দেজা ভু' বলে। সেই দেজা ভু-ই যেন ঘটল এদিন। কী অদ্ভুত মিল!
তিন বছর আগে হ্যাংঝৌ। এশিয়ান গেমসে মহিলা ক্রিকেটের প্রথম ফাইনাল। প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। ভারত জিতেছিল। এসেছিল সোনা।
তিন বছর পরে আবার একই ছবি।
আবার ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা। আবার ফাইনাল। আবার সোনা।
শুধু এবার ভারতের জয় নিয়ে কোনও সংশয় তৈরি হল না। বরং প্রথম ইনিংস শেষের পরেই ম্যাচের ভাগ্য যেন অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।
টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হরমনপ্রীত কৌর। তার পর যা হল, তাকে ‘শুরু’ বলা যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ ভারত যেন শুরু থেকেই শেষের দিকে ছুটছিল।
স্পট লাইটে মন্ধানা
স্পিন দিয়ে শুরু করেছিল শ্রীলঙ্কা। প্ল্যানটা বেশ স্পষ্ট। ভারতের ওপেনারদের আটকে রাখতে হবে। রান কমাতে হবে। শুরু থেকেই চাপ তৈরি করতে হবে।
কিন্তু সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে দিলেন স্মৃতি মন্ধানা।
বল একটু বাইরে? ব্যাট পৌঁছে গেল।
বল একটু শর্ট? চার।
ফিল্ডার পিছিয়ে গেলেন? তাতেও লাভ হল না। সৌজন্যে শেফালি।
পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার সময় ভারতের স্কোর ৫৯। তখনই বোঝা গিয়েছিল, এই উইকেটে ভারত শুধু খেলতে আসেনি। তারা ফাইনালটা জিততে এসেছে।
প্রথম উইকেটে মন্ধানা ও শেফালি ৬০ বলে ৯৯ রান তুললেন।
শেফালি থামলেন ৪৮-এ।
মন্ধানা থামলেন ৭৯-এ।
তবে তাঁর ৭৯-কে শুধু একটা সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না।
কারণ ওই ৭৯-এর মধ্যে পাঁচটি চার এবং সাতটি ছক্কা ছিল। বড় ম্যাচে ব্যাটের এই আত্মবিশ্বাসী সুইং-ই আর পাঁচজনের থেকে বড় ক্রিকেটারদের আলাদা করে দেয়।
বাকিটা ইতিহাস। সদ্য রচিত।
১১ হাজারে মন্ধানা
ফাইনালের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মন্ধানার রান ছিল ১০,৯৮৭। অর্থাৎ ১১ হাজারে পৌঁছতে দরকার ছিল মাত্র ১৩। মাত্র ১৩।
কিন্তু ক্রিকেটে ‘মাত্র’ বলে কিছু হয় না। বিশেষ করে ফাইনালে। মন্ধানা সেই ১৩-ও এমন ভাবে পার করলেন, যেন সংখ্যাটা তাঁর কাছে কোনও ব্যাপারই নয়। মহিলা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১১ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁলেন তিনি।
একটা ফাইনাল। একটা সোনা। একটা পার্সোনাল রেকর্ড।
কখনও কখনও ক্রিকেট নিজের ইতিহাস নিজেই লিখে নেয়। আজকের দিনটাও যেন ঠিক তেমন।
এশিয়ান গেমসে মন্ধানার মোট রান দাঁড়াল ১১৬। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে করেছিলেন ৩৭। ফাইনালে ৭৯। ফলে এবারের সর্বোচ্চ রান তাঁরাই ঝুলিতে।
তিন বছর আগে হ্যাংঝৌতে সেই জায়গায় ছিলেন জেমাইমা রডরিগেজ। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই কন্যা যেন পরপর এশিয়ান গেমসের সঙ্গে নিজেদের নাম জুড়ে দিলেন।
শেফালির গল্প
মন্ধানার ৭৯-এর পাশে শেফালির ৪৮ হয়তো একটু ছোট দেখাবে। কিন্তু স্কোরকার্ড সব গল্প বলে না।
গল্পের শুরুটা শেফালি ব্যাট হাতে শুরু করেছিলেন। শেষটা করলেন বল হাতে।
ইমেশা দুলানি প্রথম দিকে বেশ ভালই সেট হয়ে গিয়েছিলেন। শেফালি ব্যাপারটা বুঝে গেলেন। বলের স্পিড ও লেংথ বদলে দিলেন। ব্যাট চালালেন দুলানি। বল গেল না। উইকেটের পিছনে রিচা ঘোষের হাত থেকে বেল পড়তে বেশি সময় লাগল না।
এর পর হাসিনি পেরেরা।
আবার শেফালি।
আবার ভুল শট।
আবার ক্যাচ।
দু'টো উইকেট হয়তো সংখ্যার নিরিখে খুব বড় ঘটনা নয়। কিন্তু ফাইনালে ওই দু'টো উইকেটের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রীলঙ্কার দরকার ছিল একটা জুটি। একটা বড় পার্টনারশিপ। একটা আত্মবিশ্বাস।
শেফালি সেই আত্মবিশ্বাসটাই তৈরি হতেই দিলেন না।
আতাপাত্তু দাঁড়িয়েছিলেন, মঞ্চের পর্দা নামিয়ে দিলেন দীপ্তি
চামারি আতাপাত্তুই শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার চিত্রনাট্য কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
কিছুটা পাল্টা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক। ২১ বলে ২৯ রান। তখনও মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা হয়তো একটু হলেও লড়াইয়ের দিকে যাবে।
শেষমেশ তা হল না।
বল হাতে এলেন দীপ্তি শর্মা। স্পিনারের ভূমিকাটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন। ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করে দিলেন। একটু এগিয়ে আসতে বাধ্য করলেন। আর সেই মুহূর্তেই ভুলটা হল।
লং-অফে ক্যাচ।
আতাপাত্তু দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। যেন তিনিও বুঝে গিয়েছিলেন, এই ম্যাচে শ্রীলঙ্কার শেষ বড় দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেল।
এর পর আর কোনও নাটক ছিল না। ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা শেষেই ফের সোনা আনলেন ভারতের মেয়েরা।