
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে ১৬ অগাস্ট দিনটি হয়তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই প্যাট কামিন্সদের ৯ উইকেটে হারিয়ে রেকর্ড করলেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। কোনও দল কবে এমন একতরফাভাবে অজিদের নিজের দেশেই হারিয়েছে, তা মনে করতে পারছেন না ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
রবিবার, ১৬ অগাস্ট, জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে ছিল মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য। সেই রান তুলতে কোনও সমস্যাই হয়নি টাইগারদের। মাত্র ১৪.২ ওভারে সেই রান তুলে ডারউইনে প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনেই দুর্দান্ত জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য ভারতকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১২টি টেস্ট ম্যাচ। পাকিস্তানকে সাতটি। শ্রীলঙ্কার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এখনও পর্যন্ত ১৫টি টেস্ট খেলেও জয়ের খাতা খুলতে পারেনি তারা। সেখানে মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেই জয়ের মুখ দেখলেন হাসান-মিরাজরা।
বাংলাদেশের এই জয় অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠের আধিপত্যেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। ৩১ বছর পর নিজেদের মাঠে ভারত ছাড়া অন্য কোনও এশীয় দলের কাছে টেস্ট হারল অজিরা।
জয়ের ব্যবধানও বাংলাদেশের নাম তুলে দিয়েছে রেকর্ড বুকে। উইকেটের ব্যবধানে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম জয়। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ২০২৪ সালের রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট। সেবার পাকিস্তানের মাটিতে তাদেরই ১০ উইকেটে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৯ উইকেটের জয় সেই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে হারবে হয়তো নিজেরাও প্রত্যাশা করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ান দল। ম্যাচের প্রতিটি সেশনেই আধিপত্য দেখিয়েছে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ। দুই ইনিংসেই দুর্দান্ত বোলিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন টাইগাররা। এই জয় দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য জয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেই জয় পেল বাংলাদেশ, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে কোনও এশীয় দলের ক্ষেত্রে যা দ্রুততম।
২০২৬-এর আগে বারবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তাদের মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাধিকবার এই সিরিজকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে মনে করেছিল। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে জানিয়েছিল, ফুটবল মরশুমের মাঝামাঝি সময়ে এই সিরিজ সম্প্রচার করতে সম্প্রচারকদের তেমন আগ্রহ নেই।
সম্ভবত এর পিছনে কাজ করেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার মানসিকতা। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তুঙ্গে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অ্যাশেজ তো ছিলই, পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ছিল ট্রান্স-তাসমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ফলে অস্ট্রেলিয়ার দৃষ্টিতে এমন একটি দলের বিরুদ্ধে সিরিজ আয়োজনের প্রয়োজন ছিল না, যাদের কাছ থেকে তারা বড় কোনও প্রতিযোগিতা আশা করত না।
এমনকী এবারের সিরিজও নির্ধারিত সময়ের আগেই আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৫০তম বার্ষিকী টেস্টের জন্য ক্যালেন্ডার ফাঁকা রাখতে সিরিজটি এগিয়ে আনা হয়।
এই ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়েই অস্ট্রেলিয়ায় পা রেখেছিল বাংলাদেশ। তারা জানত, এই সফরকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ায় খুব একটা আগ্রহ বা স্বাগত হয়তো নেই। এমনকী ভারত, ইংল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দল যে নিয়মিত টেস্ট খেলে, সেই পরিচিত ভেন্যুগুলিতেও খেলতে হয়নি বাংলাদেশকে।
ফলে বাংলাদেশের সামনে ছিল দু’টি পথ—বছরের পর বছর ধরে পাওয়া এই আচরণে হতাশ হয়ে পিছিয়ে যাওয়া, অথবা মাঠে তার জবাব দেওয়া। বাংলাদেশ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়। আর তাতেই সাফল্য।
বাংলাদেশের পেসারদের আগুনে বোলিংয়ে ছাডরখার অস্ট্রেলিয়া
ডারউইনের সবুজ আভাযুক্ত পিচে টস জিতে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাংলাদেশের পেসাররা যেন আগুন ঝরাতে শুরু করেন। ২৬ বছর বয়সি হাসান মাহমুদ ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন-আপকে কার্যত ধ্বংস করে দেন। তাঁর বোলিং ফিগার ৬/৫৫। তাঁকে দুর্দান্তভাবে সাহায্য করেন তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন। বাংলাদেশের তারকা পেসার নাহিদ রানা এই ম্যাচে না থাকলেও তাঁর সতীর্থরা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের কোনও সুযোগ দেননি।
সঠিক জায়গায় ধারাবাহিকভাবে বল করার শৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রিত পেস বোলিংয়ের সামনে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্টে এটিই অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর।
প্রথম দিনেই হাঁটু গেড়ে বসা অস্ট্রেলিয়া আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। ইনিংসের শুরুতে মিচেল স্টার্কের সংক্ষিপ্ত ঝলকানি ছাড়া বাংলাদেশের ব্যাটারদের উপর কোনও উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারেনি হেজালউডরা।
বাংলাদেশের হয়ে ওপেনার তানজিদ তামিম দুর্দান্ত শতরান করেন। ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংসে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাট করেন। তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব কতটা।
এরপর মেহেদি হাসান মিরাজের ১৫৪ বলে ৬৫ এবং মুশফিকুর রহিমের ৫৫ বলে ৩৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস বাংলাদেশকে বড় স্কোরের দিকে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
প্রথম ইনিংসে বিশাল লিড পাওয়ার পর অর্ধেক কাজ কার্যত সমাপ্ত করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারা এও জানত, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিরুদ্ধে সামান্য সুযোগ দিলেও ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তাই দ্বিতীয় ইনিংসেও একই আগ্রাসন নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ। এবার নেতৃত্ব দেন স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ।
হাসান মাহমুদ শুরুতেই দুই ওপেনার ট্রাভিস হেড ও জেক ওয়েদারাল্ডকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে নেন মিরাজ। সঠিক জায়গায় বল ফেলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ক্রমাগত চাপে রাখেন তিনি।
দুর্দান্ত বোলিং করে ৫/৬৬-এর পরিসংখ্যান নিয়ে ইনিংস শেষ করেন মিরাজ। ক্যামেরন গ্রিন শতরান না করলে দ্বিতীয় ইনিংসেও অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
কিন্তু গ্রিনের শতরানও অস্ট্রেলিয়াকে রক্ষা করতে পারেনি। ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনও প্রতিপক্ষকে ভুলভাবে বিচার করল অস্ট্রেলিয়া। ২০২৪ সালে গাব্বায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও ধাক্কা খেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। এদিকে চতুর্থ দিনের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর প্রাক্তন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক রিকি পন্টিংও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন আনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পন্টিংয়ের দীর্ঘদিনের সতীর্থ ম্যাথিউ হেডেনও অস্ট্রেলিয়ার কম্বিনেশন নিয়ে নতুন করে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, ট্রাভিস হেডকে তিন নম্বরে নামিয়ে নতুন ওপেনিং জুটি তৈরি করার কথা ভাবতে পারে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার সমস্যা আরও বাড়ছে দলের বয়সের কারণে। ক্যামেরন গ্রিন ছাড়া দলের আর কোনও ক্রিকেটারের বয়স ৩০ বছরের নিচে নয়।