
বাবা অথবা মা এমনকি সন্তানের মৃত্যু যন্ত্রণা চেপে রেখে নিজের প্ৰিয় দলের ম্যাচ দেখতে আসার নজির প্রচুর রয়েছে। তবে সদ্য প্রয়াত দাদাকে মর্গে রেখে ম্যাচ দেখতে আসার গল্প খুব বেশি নেই। এই গল্প হৃদয় ছুঁয়ে যায় ফুটবল সমর্থকদের। ইস্টবেঙ্গলের খেলা যারা নিয়মিত মাঠে গিয়ে দেখেন, তাঁরা চিন্ময় দত্তকে চেনেন। দলের সবচেয়ে খারাপ সময়ও, গ্যালারিতে দেখা মেলে তাঁর। দলটা যেখানেই খেলতে যাক, স্ট্যান্ডে লাল-হলুদের জন্য গলা ফাটান চিন্ময়।
দল যখন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দোরগোড়ায় তখনও প্রবল মানসিক যন্ত্রণা নিয়েই বসেছেন গ্যালারিতে। প্রিয় দলকে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হতে দেখে আবার ফিরেছেন সেই মর্গে। যেখানে ময়নাতদন্তের জন্য শায়িত তাঁর দাদার দেহ। সবটা মিটে যাওয়ার পর দাদার দেহ বাড়ি নিয়ে এসে মাকে দেখিয়েছেন। ভোরে সেরেছেন দাহকাজ।
চিন্ময় দত্ত ইস্টবেঙ্গল গ্যালারির পরিচিত মুখ। যাদবপুর সন্তোষপুরের এই বছর চুয়ান্নর সমর্থক শুধু কলকাতা বা জেলার মাঠে ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে ছুটে যান তা নয়, ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচে ভিন্নাজ্যের গ্যালারিতেও বার বার দেখা যায় তাঁকে। চলতি মাসের ৭ তারিখ সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় তাঁর দাদা অরুণ দত্তের। একদিকে হাসপাতালে ছোটাছুটি, অন্যদিকে বৃদ্ধা মায়ের দেখভাল। তবু চিন্ময় চেয়েছিলেন প্রিয় দলের শেষ ম্যাচে গ্যালারিতে থাকবেন। গোটা পরিবারের জন্য টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু কাশী ম্যাচের আগের রাতে মারা যান তাঁর দাদা।
চিন্ময় বলছিলেন, 'সেরিব্রাল অ্যাটাকের সময় দাদা রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। তখন ওর পা কিছুটা কেটে যায়। তাই মৃত্যুর পর চিকিৎসক ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। বার বার অনুরোধ করার পরেও নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি। যখন আমরা ওর দেহ নিয়ে মর্গে পৌঁছোই, ওরা জানায় রাত হয়ে যাবে।' তখনও চিন্ময় ভেবেছিলেন, এই পরিস্থিতিতে মাঠে যাবেন না। কিন্তু মনও টানছিল। স্ত্রী বলেন, মাঠে গেলে এই যন্ত্রণা থেকে অন্তত কিছুটা মুক্তি পাবেন। শেষ মুহূর্তে মাঠে ঢোকেন। 'বিশ্বাস করুন, আমি স্বার্থপরের মতো সেদিন মাঠে গেছি। কারণ জানি, ইস্টবেঙ্গলই আমাকে এই চরম যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে। দল যখন পিছিয়ে, টেনশন সহ্য করতে পারছিলাম না। একবার ভাবলাম বেরিয়ে যাই। তারপর ভাবলাম শেষ পর্যন্ত দেখেই যাই। বিশ্বাস করুন, জিতে যাওয়ার পর যখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো মাঠে ঢুকে আনন্দ করছে, কী যে ভাল লেগেছে! এই প্রজন্মটা প্রথম জাতীয় স্তরের লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে দেখল দলকে। তবে আমি অনুরোধ করায় সেদিন আমাকে কেউ আবির দেয়নি। মাঠে ঢুকে একবার শুধু মাঠে হাত দিয়ে প্রণাম করে বাড়ি চলে যাই। তখনও মা জানে না, দাদা আর নেই। মর্গ থেকে দাদাকে নিয়ে মাকে দেখালাম। তারপর শ্মশান।'
কলকাতা ময়দানে কান পাতলে এমন অনেক কাহিনী শোনা যায়। আর এই গল্পগুলোই, এই ফ্যানেরাই ময়দানের সম্পদ।