
প্রয়াত বাবাকে উদ্দেশ্য করে আবেগঘন বার্তা লিখলেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। বাবাকে ছাড়া কীভাবে জীবন ও ফুটবল কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ এক পোস্টে মেসি জানিয়েছেন, বাবাকে ছাড়া তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত ৭ অগাস্ট প্রয়াত হন মেসির বাবা জর্জ মেসি। ছেলের ফুটবলজীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। রোসারিওয়ে মেসির ফুটবলযাত্রার একেবারে শুরু থেকেই বাবা জর্জ ছিলেন তাঁর ম্যানেজার, এজেন্ট এবং সবচেয়ে কাছের পরামর্শদাতা। ছেলের বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার পুরো যাত্রাতেই তিনি পাশে ছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর ফুটবলবিশ্বে শোকের আবহ তৈরি হলেও মেসি এতদিন কোনও প্রকাশ্য মন্তব্য করেননি। বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে নিজের শহর রোসারিওয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপের সময়ও বাবার অসুস্থতার কারণে মেসিকে কঠিন মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচে তিন গোল করে দুর্দান্ত শুরু করলেও প্রথম গোলের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। মাঠেই কেঁদে ফেলেছিলেন মেসি।
পরে মেসি জানিয়েছিলেন, ওই কান্নার সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক ছিল না। ম্যাচের আগে তিনি কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন।
বাবার ইচ্ছেতেই বিশ্বকাপে খেলেছিলেন মেসি
ইনস্টাগ্রামে দীর্ঘ চিঠিতে মেসি জানিয়েছেন, এই বছর বিশ্বকাপে খেলতে তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। বাবার সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই তিনি বিশ্বকাপে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর নামের পাশে ছিল আটটি গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট।
মেসি জানিয়েছেন, বাবাকে বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি এনে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিকভাবে নিজেকে আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। নিজের শরীর নিয়ে সমস্যায় ভুগছিলেন বলেও জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
বাবাকে ছাড়া কী করবেন, তা জানেন না মেসি। এমনকী ফুটবল আর কতদিন খেলবেন, তা নিয়েও তাঁর মনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
মেসি আপাতত ফুটবল থেকে অনির্দিষ্টকালের বিরতি নিয়েছেন এবং তাঁর ক্লাব ইন্টার মায়ামি তাঁকে ছুটি দিয়েছে। বাবাকে নিয়ে মেসির এই আবেগঘন পোস্ট ফুটবলবিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও পোস্টটির কমেন্টে মেসির প্রতি সমবেদনা ও সমর্থন জানিয়েছেন।
বাবাকে মেসির লেখা পুরো চিঠি
'বাবা, এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি চলে গিয়েছ। আমি এটা মেনে নিতে চাই না। অথবা বলা ভালো, আমি ভেঙে পড়তে চাই না। এটা ভাবাই আমার কাছে খুব কঠিন যে তোমাকে আর কখনও দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছিলে এবং তোমার চলে যাওয়াই হয়তো তোমার জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি অনেক তাড়াতাড়ি চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে উপভোগ করার জন্য এখনও অনেক কিছু বাকি ছিল।'
'তুমি বারবার আমাকে শেষবারের মতো একটি বিশ্বকাপে খেলতে বলেছিলে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে তোমার শারীরিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ ছিল। সেই প্রথম কোনও টুর্নামেন্টে তুমি থাকতে পারতে না। কিন্তু মা বারবার বলছিলেন, তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং আগের মতো অবস্থায় ফিরে আসবে। আমি তোমাকে বারবার বলেছিলাম, আমরা ফাইনালে পৌঁছব, যাতে তুমি সেখানে যেতে পারো।'
'প্রতিটি ম্যাচ শেষ করার পর আমি তোমার মেসেজের অপেক্ষা করতাম এবং তোমার মেসেজ না পেয়ে তোমাকে খুব মনে পড়ত। তখনই বুঝতে পারছিলাম পরিস্থিতি কতটা খারাপ। তবুও যতটা সম্ভব দূর পর্যন্ত যাওয়ার কথা ভাবা বন্ধ করিনি। যাতে তোমার জন্য সময় বের করতে পারি এবং তুমি অন্তত আমার একটি ম্যাচ দেখতে পারো।'
'আমরা ফাইনালে পৌঁছলাম, কিন্তু তুমি সেখানে থাকতে পারলে না। আমি বিশ্বকাপ জিততে চেয়েছিলাম, যাতে ট্রফিটা তোমার কাছে নিয়ে গিয়ে তোমাকে নতুন একটি ট্রফি দেখাতে পারি। কিন্তু পারিনি। আমার পা আর এগোতে পারেনি। এবার আমি শারীরিকভাবে সবটা দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। আমি কখনও পুরোপুরি সুস্থ বোধ করিনি।'
'আমি যখন তোমার কাছে পৌঁছলাম, তুমি ভেবেছিলে আমরা পেনাল্টিতে ফাইনাল হেরে গিয়েছি। কী হয়েছিল, তা নিয়ে আমরা কথা বলতে পারিনি। তুমি কোনও কিছুই উপভোগ করতে পারোনি। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু তুমি জানো না, প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি। আবারও তুমি ঠিক ছিলে—আমাকে সেখানে গিয়ে খেলতেই হয়েছিল।'
'আমি তোমাকে এসব বলছি, কারণ এটিই একমাত্র বিষয় ছিল যা নিয়ে আমাদের কথা বলা হয়নি। কারণ বাকি সবকিছুই তুমি জানতে। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম এবং আমার কাজের ব্যস্ততা যখনই সুযোগ দিত, আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতাম।'
'আমি জানি না তোমাকে ছাড়া আমি কী করব। কীভাবে এগিয়ে যাব, তাও জানি না। আমি শুধু ফুটবলই খেলেছি। আর এখন কতদিন আরও ফুটবল খেলব, তা নিয়েও আমার মনে অনেক সংশয় তৈরি হয়েছে। তুমি একেবারে শুরু থেকে আমার পাশে ছিলে এবং আমরা শেষের এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। আর একটু সময় তুমি কেন থাকতে পারলে না, যাতে আমরা এটা একসঙ্গে শেষ করতে পারতাম?'
'আমি জানি, তোমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিত তোমার পরিবারকে দেখা—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানদের এবং সবার অজান্তে সবচেয়ে বেশি আমাকে খেলতে দেখা। ছোটবেলা থেকেই এমনটাই হয়ে এসেছে। কাজ থেকে বাড়ি ফিরেই তুমি আমাকে প্রতিটি অনুশীলনে নিয়ে যেতে। অনেক অনুশীলনে মা আমাকে নিয়ে যেতেন, কারণ তখন তুমি কাজে ব্যস্ত থাকতে।
অবশ্যই, তুমি আমার একটি ম্যাচও কখনও মিস করোনি। আমাকে খেলতে দেখে তুমি যেমন কষ্ট পেতে, তেমনই উপভোগও করতে। যদিও আমাকে খুব বেশি প্রশংসা করতে না।'
'তুমি আমার বাবা, আমার বন্ধু এবং আমার প্রতিনিধি ছিলে। প্রতিটি পরিস্থিতিতে তুমি সেই মানুষটাই ছিলে, যাকে আমার প্রয়োজন ছিল। আর কোনও বিষয়ে তুমি কখনও ভুল ছিলে না। কিছু তর্ক বা মতবিরোধ বাদ দিলে, শেষ পর্যন্ত তুমিই ঠিক ছিলে। শেষ পর্যন্ত সবসময় ঠিক সেটাই হয়েছে, যা তুমি বলেছিলে। তোমাকে আমি ভীষণভাবে মিস করব। কিন্তু তুমি সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে। বিশেষ করে আমি যেভাবে আমার সন্তানদের বড় করছি, তার মধ্যে তুমি সবসময় উপস্থিত থাকবে। কারণ তুমি এবং মা যেভাবে আমাকে বড় করেছ, আমিও তাদের সেভাবেই শেখাচ্ছি এবং বড় করছি।'
'শান্তিতে থেকো বাবা। উপর থেকে আমাদের দেখো, যেমনটা এখানে থাকতে দেখেছিলে। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি বাবা।'