
আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে পরাজয়ে ভারাক্রান্ত মিশর। তবে নেটিজেনরা এটিকে অবশ্য তকমা দিচ্ছে 'VAR-আক্রান্ত'। বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ১৬-এর এই টানটান ম্যাচে ভিলেন হয়ে রইল FIFA-র VAR। মিশরের হেড কোচ হোসাম হাসানের অভিযোগ, তাঁর দলের সঙ্গে সঠিক আচরণ করা হয়নি। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ফাইনাল ১১ মিনিটের নাটকীয় পরিবর্তনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন তিনি।
ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো, লিও মেসি এবং এনজো ফার্নান্ডেজের পরপর ৩টি গোটে কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের জায়গা পাকা করে নেয় আর্জেন্টিনা। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা যখন সেলিব্রেশন মুডে তখন মিশর শিবিরের দাবি, ২টি অনৈতিক সিদ্ধান্তের জেরেই পরাজয়ের মুখ দেখতে হল তাদের।
কী বক্তব্য মিশরের?
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মিশরের হেড কোচ হাসান বলেন, 'ফলাফল নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। ম্যাচে যা যা হল, তা নিয়ে আমি হতবাক। আমাদের সঙ্গে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে। আমাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।' আর্জেন্টিনার তুলনায় তাঁর টিম ভাল খেলেছে বলেও দাবি করেন হাসান। তাঁর কথায়, 'ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের তুলনায় আমরা ভাল খেলেছি। অনেকক্ষেত্রে তো ওদের ছাপিয়েও গিয়েছি। সব দিক থেকেই আমরা ভাল অবস্থানে ছিলাম। তবে ফলাফল হল অন্যরকম। মাঠে কিছু ইন্টারন্যাল ফ্যাক্টর আর মাঠের বাইরের কিছু বিষয়ের কারণে এই ফলাফল হল।'
ইজিপ্টের দ্বিতীয় গোল বাতিল হওয়ার পরই VAR-এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন হেড কোচ। আর্জেন্টিয়ার তৃতীয় গোলটির সময়ে পেনাল্টির আবেদন জানিয়েছিল মিশর। তবে তা খারিজ হয়ে যায়। তা নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেন দলের কোচ।
স্পটলাইটে VAR
ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে প্রথমার্ধের শুরুতেই এগিয়ে গিয়েছিল মিশর। এমনকী, পেনাল্টি দিয়েও মেসির শট আটকে হিরো হয়ে যান মিশরের গোলকিপার মোস্তাফা শোবেইর। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে ৫৮তম মিনিটে তারা ভেবেছিল আর্জেন্টিয়াকে আরও একটি ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়েছে।
হাসিম হাসান ডিপ ইনসাইন থেকে বল নিয়ে দৌড়ন। খুঁজে নেন মহম্মদ সালাহকে। তিনি নিঁখুত পাস দেন মোস্তাফা জিকোকে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে কাটিয়ে জালে বল জড়িয়ে দেন তিনি। সেলিব্রেশনে মেতে ওঠে মিশর।
তবে সেই সেলিব্রেশন বেশিক্ষণ চলতে পারেনি। লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে করা মারওয়ান আটিয়ার একটি ফাউল দেখতে পায় VAR কমিটি। পিচের প্রান্তে ডেকে পাঠানো হয় রেফারি ফ্রাঙ্কোইস লেটেক্সিয়ারকে। রিপ্লেতে দেখা যায়, আটিয়া আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডরের জার্সি টেনে ধরছেন, আর্জেন্টিনা তখন অ্যাটাকে যাচ্ছিল। লেটেক্সিয়ার গোল বাতিল ঘোষণা করেন। অ্যাটাকের সময়ে করা ফাউল এবং তারপরই হওয়া গোলের জেরে এই সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয় VAR কমিটির পক্ষ থেকে।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর দু'ভাগ হয়ে যান সমর্থকরা। প্রাক্তন ইংল্যান্ড গোলকিপার রব গ্রিনের প্রশ্ন, 'এটা VAR-এর এক্তিয়ারের মধ্যেই পড়ে না। পিচের ফুল লেন্থের মধ্যে এটি হয়েছে।' প্রাক্তন FIFA রেফারি ড. জোয়ী মাছনিক যদিও VAR-এর সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, 'অ্যাটাকের সময়ে ফাউল করা হয়েছিল। VAR অন ফিল্ড রিভিউ দিয়ে ঠিকই করেছে।'
তবে এই গোল বাতিলের পরও দমে যাননি সালাহরা। ঠিক ১০ মিনিট পরই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে আবার আঘাত আনে মিশর। সালাহ এবং হাসান একসঙ্গে উঠে আসেন, জিকো আবারও গোল করতে সক্ষম হয়। সেই গোল অবশ্য ছিল ১০০% সঠিক। ফারাওরা ২-০ গোলে এগিয়ে যায়।
VAR অন্যায় করেছে, দাবি মিশরের
এরপরই শুরু হয় টানটান উত্তেজনা। রুদ্ধশ্বাস ১৩ মিনিটের মধ্যে প্রথমে এক গোল শোধ করেন রোমেরো। তারপর সমতা ফেরান মেসি। স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষ পর্যায়ে এনজো ফার্নান্ডেজ জয়সূচক গোল করে কোয়ার্টার ফাইনালের রাস্তা খুলে দেন। তবে ইজিপ্ট মনে করছে আর্জেন্টিনার এই তৃতীয় গোলে VAR-এর হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল।
সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন ফারাওরা। অ্যালিক্স ম্যাক অ্যালিস্টার পেনাল্টির জন্যও জোরাল সওয়াল করেন। তবে রেফারি খেলা চালিয়ে যান। এরপরই ইজিপ্ট শিবির ক্ষোভ উগরে দেয়। রেফারি হলুদ কার্ড দেখিয়ে দেন তাদের হেড কোচ হাসানকেও। দলের এক স্টাফকে লাল কার্ড পর্যন্ত দেখানো হয়।
এমনকী কেন আটলান্টায় দুপুরে (স্থানীয় সময়) এই ম্যাচ শিডিউল করা হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মিশরের কোচ। তিনি বলেন, 'কারা এই ম্যাচের শিডিউল তৈরি করেছিল? সম্ভবত তাঁরা কখনওই ফুটবল খেলেনি। দুপুরবেলায় সাধারণত মানুষ হাওয়া খেতে বেরোয়, ব্রাঞ্চ করতে যায়, মাঠে খেলতে কখনওই যায় না। অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্বচ্ছতার অভাবেই এই ফলাফল হল। আমার দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি গর্বিত। আমরা যোগ্য সম্মান পাইনি।'
ফাইনাল হুইসল বাজার পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন গোলদাতা জিকোও। তিনি বলেন, 'রেফারিটা ভাল ছিল না। পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। আমাদের সঙ্গে পরিষ্কার অন্যায় হয়েছে। খেলার শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে অন্যায় করেছেন উনি। আমরা জিতে চাই, উনি চাইছিলেনই না। রিগিং হয়েছে ম্যাচে। আমাদের কোনও দোষ ছিল না।'
শুভেচ্ছা জানিয়েও আর্জেন্টিনাকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি জিকো। তিনি বলেন, 'ওয়ার্ল্ড কাপ জেতার জন্য আর্জেন্টিনাকে শুভেচ্ছা জানাই। এটাই বলতে চাই। আর কিছু নয়। ওদের আর কিছু চাই না।'
নেটিজেনদের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। আর্জেন্টিনা বিরোধীরা বলছেন, 'কমিটির টিম'। মিশরের প্রতি অন্যায় হয়েছে বলে মতে ব্রাজিল, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স ভক্তদের।
তবে বিতর্ক যা-ই হোক না কেন, ফলাফল বদল হবে না। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে। ইজিপ্ট টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছে।