
গত কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্বের বহু দেশ একটি নতুন ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েছে। বিভিন্ন উন্নত দেশে দেখা যাচ্ছে, মানুষ আগের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে সন্তান নিচ্ছে। অনেক দেশে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে জনসংখ্যা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে।
আগে ধারণা করা হত, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের চাপ, ছোট আকারের বাড়ি এবং পরিবর্তিত লাইফ স্টাইলই জন্মহার কমার প্রধান কারণ। তবে, গবেষণা এখন একটি নতুন এবং আশ্চর্যজনক দিক নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছে। বিজ্ঞানীরা এবং গবেষকরা বোঝার চেষ্টা করছেন, স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়াও জন্মহার হ্রাসের ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা রাখছে কি না।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক রিপোর্ট অনুসারে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার নীচে জন্মহার নেমে এসেছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, অনেক দেশেই মানুষ আর পর্যাপ্ত সংখ্যক সন্তান জন্ম দিচ্ছে না। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চিন, ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো উন্নত দেশে এই সমস্যা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু এই ট্রেন্ড এখন লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অনেক দেশেও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, গত ১০-১৫ বছরে জন্মহারের আকস্মিক কমে যাওয়া শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনযাপনের পদ্ধতি বদলে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে মানুষ এখন আগের চেয়ে কম মেলামেশা করছে। সম্পর্ক তৈরি করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং একাকীত্ব বাড়ছে। এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে বিয়ে এবং সন্তানদের ওপর।
যেখানে ইন্টারনেট স্পিড বেশি, সেখানে জন্মহার স্লো!
একটি গবেষণায় 4জি ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালুর পর আমেরিকা ও ব্রিটেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, যেসব এলাকায় দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট আগে পৌঁছেছিল, সেখানে জন্মহার আরও দ্রুত কমে গিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, স্মার্টফোনের আবির্ভাবের ফলে তরুণ-তরুণীরা অনলাইনে বেশি সময় কাটাচ্ছে, মুখোমুখি কম সময় কাটাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেম, বন্ধুত্ব এবং সম্পর্কের একটি বড় অংশ এখন পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষ প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের নিখুঁত জীবন দেখছে, যা সম্পর্ক নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বদলে দিচ্ছে। অনেকেই দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক এড়িয়ে চলছেন। একা বসবাসকারী তরুণ-তরুণীর সংখ্যাও বাড়ছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগে বিবাহিত দম্পতিরা কম সন্তান নেওয়ায় জন্মহার কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো সম্পর্কের অবনতি। এর অর্থ হল, প্রচুর মানুষ বিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে পৌঁছাচ্ছে না।
তবে, বিশেষজ্ঞরা শুধু স্মার্টফোনকেই দোষারোপ করেন না। ব্যয়বহুল আবাসন, চাকরির চাপ, সন্তানদের শিক্ষার খরচ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ও এর অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক দেশেই তরুণ-তরুণীরা স্থায়ী চাকরি পাওয়া এবং বাড়ি কেনা কঠিন বলে মনে করছে। ফলস্বরূপ, তারা বিয়ে এবং সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যম মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলছে। অসংখ্য রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ক্রমাগত স্ক্রিনের সামনে থাকলে একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং বিষণ্ণতা বাড়িয়ে তোলে। এটি মানুষের সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে।
কিছু দেশে সরকার এই জন্মহারের কম হওয়া রোধ করতে আর্থিক সহায়তাও দিচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো শিশু ভরণপোষণ, কর ছাড় দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও, জন্মহারে কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আর্থিক সহায়তা এই সমস্যার সমাধান করবে না, কারণ আসল পরিবর্তন মানুষের লাইফস্টাইল ও সামাজিক আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।