
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ১০ হাজার টাকার আশপাশেই ভালো 5G স্মার্টফোন পাওয়া যেত। বড় ব্যাটারি, মোটামুটি ভালো ক্যামেরা, পর্যাপ্ত RAM ও স্টোরেজের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পারফরম্যান্সও মিলত এই বাজেটে। কিন্তু এখন সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। নতুন 5G ফোন আর সেই দামে মিলছে না। কম করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। শুধু নতুন ফোনের দাম নয়, বাজারে পাওয়া ফোনের ফিচার ও কনফিগারেশনেও বদল আসছে।
কেন হঠাৎ স্মার্টফোনের দাম বাড়ছে? এর পিছনে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ভূমিকা রয়েছে? নাকি সংস্থাগুলি বাড়তি খরচের অজুহাতে বেশি দাম নিচ্ছে? বাজারের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, মেমোরির দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ এবং সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক কৌশল, এমন একাধিক কারণে ফোনের দাম বেড়েছে।
Vivo-র ফোনেই স্পষ্ট দামের পরিবর্তন
Vivo-র T সিরিজের ফোনের দিকে তাকালেই বাজারের পরিবর্তন কিছুটা বোঝা যায়। ২০২৫ সালে লঞ্চ হওয়া Vivo T4 Lite 5G-এর প্রাথমিক দাম ছিল ৯,৯৯৯ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে লঞ্চ হওয়া Vivo T5 Lite 5G-এর প্রাথমিক দাম ১৯,৯৯৯ টাকা।
অবশ্য দুটি ফোনের ফিচার ও কনফিগারেশন এক নয়। তাই একে একই ফোনের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া বলা ঠিক হবে না। তবে কম বাজেটের স্মার্টফোনের বাজারে দামের চাপ যে বাড়ছে, তা এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়। Vivo-র পাশাপাশি Samsung, Realme, Poco, Xiaomi-সহ একাধিক ব্র্যান্ডের ফোনের দাম ও কনফিগারেশনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
র্যাম ও স্টোরেজের দাম বাড়ছে কেন?
স্মার্টফোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল মেমোরি। ফোনের র্যামে সাধারণত DRAM এবং ছবি, ভিডিও, অ্যাপ-সহ অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণের জন্য NAND ফ্ল্যাশ মেমোরি ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই ধরনের মেমোরির দাম বৃদ্ধি স্মার্টফোন তৈরির খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাউন্টার পয়েন্টের রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, মেমোরির দাম বৃদ্ধির প্রভাব বিশেষ করে কম দামের স্মার্টফোন তৈরির খরচে পড়ছে। একই ধরনের হার্ডওয়্যারযুক্ত ফোন তৈরির খরচও বেড়েছে। সংস্থাটির উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, কম দামের স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে বিল অফ ম্যাটেরিয়ালস বা BOM-এর খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে BOM বলতে ফোন তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের মোট খরচকে বোঝায়।
এর অর্থ, আগে যে হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট দামে ফোন তৈরি করা সম্ভব ছিল, এখন সেই একই কনফিগারেশন তৈরি করতে সংস্থাগুলিকে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
স্মার্টফোনের দাম বাড়ার পিছনে AI-এর ভূমিকা কী?
মেমোরির দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। বর্তমানে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্য়ামাজনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থা AI পরিষেবা চালানোর জন্য বড় বড় ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। এই ডেটা সেন্টারে থাকা সার্ভারগুলির বিপুল পরিমাণ মেমোরির প্রয়োজন হয়।
বিশেষ করে High Bandwidth Memory (HBM)-এর মতো উন্নত মেমোরির চাহিদা বেড়েছে। ফলে মেমোরি উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির কাছে ডেটা সেন্টার ও AI-সংক্রান্ত বাজার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে মেমোরির চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দামেও। এর প্রভাব সাধারণ স্মার্টফোনের বাজারেও পৌঁছচ্ছে। কারণ, ফোন তৈরিতে ব্যবহৃত মেমোরির দাম বাড়লে সামগ্রিক উৎপাদন খরচও বাড়ে। সেই বাড়তি খরচের একটা অংশ সংস্থাগুলি ফোনের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
তবে স্মার্টফোনের দাম বাড়ার জন্য শুধু AI-কে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রসেসর, ডিসপ্লে, ক্যামেরা, ব্যাটারি, পরিবহণ ও বিপণনের খরচও ফোনের চূড়ান্ত দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
AI-এর অজুহাতে কি বেশি দাম নিচ্ছে সংস্থাগুলি?
মেমোরির দাম বৃদ্ধি বাস্তব সমস্যা হলেও, প্রতিটি স্মার্টফোনের দাম বাড়ার পিছনে একই কারণ কাজ করছে, এমনটা বলা যায় না। কোনও ফোনের দাম কত হবে, তা নির্ভর করে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি সংস্থার মুনাফা, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক কৌশলের উপরেও।
উৎপাদন খরচ বাড়লে সংস্থাগুলির সামনে কয়েকটি বিকল্প থাকে। তারা নিজেদের মুনাফার পরিমাণ কমাতে পারে, অন্য খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ফোনের হার্ডওয়্যারে পরিবর্তন আনতে পারে অথবা বিক্রয়মূল্য বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ, মেমোরির দাম বৃদ্ধি ফোনের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলেও, প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরো বাড়তি খরচ গ্রাহকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কোন সংস্থা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা নির্দিষ্ট মডেল ও তার দামের পরিবর্তন দেখে বিচার করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি চাপে ১৫ হাজার টাকার কম দামের ফোন
স্মার্টফোনের বাজারে দামের এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বাজেট সেগমেন্টে। ওই রিসার্চের উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতে স্মার্টফোনের শিপমেন্ট আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ কমেছে। ১৫ হাজার টাকার কম দামের ফোনের ক্ষেত্রে এই পতন প্রায় ৪৫ শতাংশ।
শিপমেন্ট বলতে নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে পাঠানো ফোনের সংখ্যা বোঝায়। এটি সরাসরি গ্রাহকদের কেনাকাটার সংখ্যা নয়। তবে এই পরিসংখ্যান কম দামের স্মার্টফোনের বাজারে চাপের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে বাজেট ফোন কিনতে চাওয়া গ্রাহকদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে। তাঁরা ফোন কেনা পিছিয়ে দিতে পারেন, পুরনো ফোন আরও কিছুদিন ব্যবহার করতে পারেন অথবা বেশি টাকা খরচ করে পরের দামের সেগমেন্টে যেতে পারেন।
১০ হাজার টাকার আশপাশে এখনও কিছু ফোন পাওয়া যায়। বিশেষ করে পুরনো মডেল বা বিভিন্ন অফারে এই দামের ফোন মিলতে পারে। কিন্তু 5G, ভালো ডিসপ্লে, পর্যাপ্ত র্যাম ও স্টোরেজ, ভালো ক্যামেরা এবং বড় ব্যাটারির সমন্বয় এই বাজেটে পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
দাম বাড়ানোর পাশাপাশি ফিচারেও কাটছাঁট
মেমোরির দাম বাড়ায় সংস্থাগুলি শুধু ফোনের দাম বাড়াচ্ছে না, কিছু ক্ষেত্রে ফোনের কনফিগারেশনেও পরিবর্তন আনছে। কম স্টোরেজের ভ্যারিয়েন্টের উপর বেশি জোর দেওয়া, ক্যামেরার বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এবং কম দামের সেগমেন্টে 4G ফোনের গুরুত্ব বজায় রাখা এর মধ্যে পড়তে পারে।
গত কয়েক বছরে ভারতে 5G পরিষেবা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম দামের 5G ফোনের বাজারেও প্রতিযোগিতা বেড়েছিল। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সংস্থাগুলি তুলনামূলক কম দামে বেশি ফিচার দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু উৎপাদন খরচ বাড়ায় সেই কৌশল ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। ফলে ১০ হাজার টাকার ফোনে 5G থাকলেও ক্যামেরা, ডিসপ্লে, প্রসেসর কিংবা স্টোরেজের ক্ষেত্রে কিছু সমঝোতা করতে হতে পারে।
ফোনের গড় দাম বাড়ছে, কমছে শিপমেন্ট
ভারতের স্মার্টফোন বাজারে আরও একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। IDC-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে দেশে স্মার্টফোনের শিপমেন্ট আগের বছরের তুলনায় ৪.১ শতাংশ কমে প্রায় ৩.১ কোটি ইউনিট হয়েছে। তা সত্ত্বেও ফোনের গড় বিক্রয়মূল্য বেড়ে ৩০২ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছরের তুলনায় ১০.৪ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ, বাজারে ফোন পাঠানোর সংখ্যা কমলেও বিক্রি হওয়া ফোনের গড় দাম বেড়েছে। এর পিছনে তুলনামূলক দামি স্মার্টফোনের চাহিদা ও বাজারের প্রিমিয়াম সেগমেন্টের গুরুত্ব বৃদ্ধির মতো বিষয় রয়েছে।
Counterpoint Research-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের স্মার্টফোনের শিপমেন্ট ১১ শতাংশ বেড়েছিল। মোট স্মার্টফোন শিপমেন্টের মধ্যে এই সেগমেন্টের অংশ বেড়ে ২২ শতাংশে পৌঁছেছিল।
তবে দামি ফোনের বাজার বাড়ার অর্থ এই নয় যে সব গ্রাহকই বেশি দামের ফোন কিনছেন। বাজেট ফোনের গ্রাহকদের কাছে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করাও বড় বিষয় হতে পারে।
EMI-তে দামি ফোন কেনা সহজ, বাজেট ফোনে বাড়তি খরচই বড় বাধা
দামি স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে EMI বা কিস্তিতে টাকা দেওয়ার সুবিধা কেনাকাটাকে সহজ করতে পারে। একবারে ৪০-৫০ হাজার টাকা খরচ না করে মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ফোন কেনার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, ১০ হাজার টাকার ফোন কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত ২-৩ হাজার টাকা খরচ করা অনেক গ্রাহকের পক্ষেই কঠিন। কারণ, এই বাড়তি টাকা ফোনের মোট দামের তুলনায় অনেকটাই বেশি।
এই কারণেই কম দামের ফোন তৈরির ক্ষেত্রে খরচের সামান্য বৃদ্ধিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দামি ফোনের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলি দাম, মুনাফা ও ফিচারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেতে পারে।
১০ হাজার টাকায় ভালো 5G ফোন কি আর পাওয়া যাবে না?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। ভারতের বাজারে কম দামের স্মার্টফোনের বিপুল চাহিদা রয়েছে। তাই এই সেগমেন্ট পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া সংস্থাগুলির পক্ষে সহজ নয়।
তবে আগামী দিনে এই বাজেটে ভালো ফিচারের ফোনের সংখ্যা কমতে পারে, অথবা একই দামে ফোন কিনতে গেলে কিছু বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে আপোস করতে হতে পারে। আবার পুরনো মডেলের দাম কমা, বিশেষ অফার কিংবা নতুন সংস্থার প্রতিযোগিতার ফলে গ্রাহকেরা কিছুটা স্বস্তিও পেতে পারেন।
আগামী দিনে কি আরও বাড়বে স্মার্টফোনের দাম?
কাউন্টার পয়েন্ট রিসার্চ ২০২৬ সালে ভারতের স্মার্টফোন বাজারে শিপমেন্টের পরিমাণ প্রায় ১৩ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, মেমোরির দাম বৃদ্ধির চাপও বাজারের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তবে ভবিষ্যতে প্রতিটি স্মার্টফোনের দামই বাড়বে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। উৎসবের মরশুমে ব্যাঙ্ক অফার, এক্সচেঞ্জ বোনাস, ছাড় এবং পুরনো মডেলের দাম কমার ফলে গ্রাহকেরা সুবিধা পেতে পারেন। আবার উৎপাদন খরচ কমলে বা প্রতিযোগিতা বাড়লেও দামের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, স্মার্টফোনের দাম বৃদ্ধির পিছনে মেমোরির বাড়তি খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। AI-এর জন্য ডেটা সেন্টারে মেমোরির চাহিদা বৃদ্ধি সেই চাপের অন্যতম উৎস। কিন্তু এর পাশাপাশি সংস্থাগুলির মূল্য নির্ধারণের কৌশল এবং বাজারের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।