
পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মেশানোর যে উদ্যোগ ভারত নিয়েছে, তা একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমানোর পথ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই জলসঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে। কারণ, ইথানল তৈরির মূল কাঁচামাল, ধান, আখ ও ভুট্টা, এই তিনটি ফসলই বিপুল পরিমাণ জলনির্ভর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে রয়েছে কৃষিক্ষেত্রেই। Intergovernmental Panel on Climate Change-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষকরা জানিয়েছেন, ইথানল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ফসলগুলির চাষে বিপুল জল লাগে, যা দেশের জলসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
ইথানল মিশ্রণ আসলে কী? সহজভাবে বলতে গেলে, পেট্রোলের সঙ্গে উদ্ভিদ-ভিত্তিক অ্যালকোহল, ইথানল মিশিয়ে জ্বালানি তৈরি করা হয়। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো সম্ভব। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার পেছনে যে জলব্যয় রয়েছে, সেটাই এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য বলছে, চাল থেকে মাত্র ১ লিটার ইথানল তৈরি করতে প্রায় ১০,০০০ লিটার বা তারও বেশি জল লাগে। কারণ, ধান চাষেই লাগে বিপুল সেচজল, প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার জল প্রয়োজন হয়। আবার ২.৫ থেকে ৩ কেজি ধান থেকে মাত্র ১ লিটার ইথানল পাওয়া যায়। ফলে সামগ্রিক জলব্যয় অত্যন্ত বেশি।
ভুট্টা বা আখের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব আলাদা নয়। ভুট্টা থেকে ১ লিটার ইথানল উৎপাদনে প্রায় ৪,৬০০ লিটার এবং আখের ক্ষেত্রে প্রায় ৩,৬০০ লিটার জল প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় উৎপন্ন বর্জ্য জল, যা যথাযথভাবে শোধন না হলে ভূগর্ভস্থ জলকে দূষিত করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের জল পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। NITI Aayog আগেই সতর্ক করে জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলিতে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। এমন অবস্থায় ইথানল উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ জল ব্যবহার ভবিষ্যতে বড় সঙ্কট ডেকে আনতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, দেশের বহু ইথানল উৎপাদন কেন্দ্র এমন রাজ্যেই অবস্থিত, যেখানে ইতিমধ্যেই জলাভাব প্রকট। মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ বা কর্নাটকের মতো রাজ্যে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। অথচ সেখানেই আখভিত্তিক ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।