
8th Pay Commission: অষ্টম পে কমিশনের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য বড় প্রস্তাব জমা পড়ল। মিনিমাম বেতন ১৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৯ হাজার টাকা করার আর্জি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ন্যূনতম পেনশন ৯ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছে ভারত পেনশনার্স সমাজ(BPS)। শুধু বেতন বা পেনশন নয়, DA-DR দ্রুত কারেকশন, ক্যাশলেস চিকিৎসা, মেডিক্যাল অ্যালাওয়েন্সের মতো একাধিক দাবিও জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বেতন, পেনশন, ভাতা এবং অন্যান্য পরিষেবা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ৮ম পে কমিশনের কাজ। এই পরিস্থিতিতে কর্মী এবং পেনশনভোগীদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করছে কমিশন। সেই আলোচনাতেই নিজেদের দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরছে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলি। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ভারত পেনশনার্স সমাজের (Bharat Pensioners Samaj) একাধিক প্রস্তাব। সংগঠনের প্রতিনিধিরা গত ৭ অগাস্ট নয়াদিল্লিতে ৮ম পে কমিশনের আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে মিনিমাম বেতন, ন্যূনতম পেনশন থেকে শুরু করে ডিএ-ডিআর এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে একগুচ্ছ সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। ৬৯,০০০ টাকার মিনিমাম স্যালারি বা ৪৫,০০০ টাকার মিনিমাম পেনশন এখনও লাগু হয়নি। এগুলি ভারত পেনশনার্স সমাজের দাবি। ৮ম পে কমিশনের সুপারিশ, তার পর কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে গুজবে কান দেবেন না। তবে, প্রস্তাব গৃহীত হলে যে তা সরকারি কর্মীদের জন্য আনন্দের বিষয় হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মিনিমাম পেনশন ৪৫,০০০ টাকা করার দাবি
বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের ন্যূনতম পেনশন ৯ হাজার টাকা। ভারত পেনশনার্স সমাজ এই অঙ্ক এক ধাক্কায় বাড়িয়ে ৪৫,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমান মিনিমাম পেনশনের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি মিনিমাম পেনশন করার দাবি জানানো হয়েছে। শুধু ন্যূনতম পেনশন বাড়ানোর কথাই নয়, সংগঠনের প্রস্তাব অনুযায়ী পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হতে পারে।
BPS-এর দাবি, কোনও কর্মীর চাকরিজীবনের শেষ বেতন অনুযায়ী পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শেষ প্রাপ্ত বেতনের ৬৭% পর্যন্ত মিনিমাম পেনশন হিসেবে বিবেচনা করা হোক। একই সঙ্গে, ফ্যামিলি পেনশনও শেষ বেতনের ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সমস্ত বিষয়ই এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে।
মিনিমাম বেতন ৬৯,০০০ টাকা, কীভাবে হিসেব?
বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের মিনিমাম বেসিক পে ১৮,০০০ টাকা। সেটি বাড়িয়ে ৬৯,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে BPS। কেন? মূল কারণটি হল ৩.৮৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। এই ফ্যাক্টর অ্যাপ্লাই করলে বর্তমান ১৮,০০০ বেসিক পে বেড়ে প্রায় ৬৯,০০০ টাকা হতে পারে।
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কী?
সরকারি কর্মীরা এমনিই জানেন। সহজ ভাষায়, আগের বেসিকের তুলনায় যতগুণ বাড়ানো হচ্ছে, সেই গুণিতককেই ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বলে। প্রস্তাব অনুযায়ী ৩.৮৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বলা হচ্ছে। তবে এখনও সেটা ফাইনালি গ্রহণ করা হয়নি। এটি ভারত পেনশনার্স সমাজের প্রস্তাব মাত্র।
পরিবারে কত জন, সেটাও বেতনের হিসাবে?
BPS-এর প্রস্তাবের মধ্যে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ফ্যামিলি ইউনিট-এর আকার পরিবর্তন।
সংগঠনটি ন্যূনতম বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে বাড়িয়ে ৫.২ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
তাদের প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী,
কর্মী: ১ জন
স্বামী বা স্ত্রী: ১ জন
দুই সন্তান: ০.৮ করে
বাবা-মা: ০.৮ করে
এই হিসাবকে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করার দাবি জানানো হয়েছে। পরিবারের প্রয়োজন এবং জীবনযাত্রার খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বছরে দু'বার নয়, তিন মাস অন্তর DA-DR?
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী এবং পেনশনভোগীদের জন্য ডিয়ারনেস অ্যালাওয়েন্স বা DA এবং ডিয়ারনেস রিলিফ বা DR অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণত বছরে দু'বার DA এবং DR সংশোধন করা হয়। জানুয়ারি এবং জুলাইকে কেন্দ্র করে এই সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু ভারত পেনশনার্স সমাজ চায়, বছরে দু'বারের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর DA এবং DR সংশোধন করা হোক।
BPS-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, তিন মাসের গড় বেতনের ভিত্তিতে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ক্ষতিপূরণের হিসাব করে DA ও DR সংশোধন করা যেতে পারে।
অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি যদি দ্রুত বাড়ে, তা হলে কর্মী ও পেনশনভোগীদের মহার্ঘ ভাতা সংশোধনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না; এমনটাই সংগঠনের প্রস্তাবের মূল বক্তব্য।
এ ছাড়াও DR ২৫ শতাংশের বেশি হয়ে গেলে সেটিকে মূল পেনশনের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
পেনশনভোগীদের জন্য ৫,০০০ টাকা মেডিক্যাল অ্যালাওয়েন্সের দাবি
অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের চিকিৎসা খরচ নিয়েও প্রস্তাব দিয়েছে BPS।
সংগঠনের দাবি, পেনশনভোগীদের জন্য মাসে ৫,০০০ টাকা নির্দিষ্ট চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হোক। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল এবং কেন্দ্রীয় সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা বা CGHS-এর আওতার বাইরে থাকা এলাকার পেনশনভোগীদের জন্য নগদহীন বা cashless healthcare ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ চিকিৎসার সময় প্রথমে নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে পরে টাকা ফেরত পাওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ক্যাশলেস চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গ্রাম ও ছোট শহরে থাকা অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের জন্য এই দাবি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংগঠনটি।
৬৫ বছর বয়স থেকে অতিরিক্ত পেনশন?
বয়স্ক পেনশনভোগীদের জন্য বয়সের সঙ্গে অতিরিক্ত পেনশনের ব্যবস্থার দাবিও উঠেছে।
BPS চায়, ৬৫ বছর বয়স থেকে অতিরিক্ত পেনশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। পাঁচ বছর অন্তর বয়সের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পেনশনের স্ল্যাব তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
এর ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন খরচের চাপ সামলাতে পেনশনভোগীরা অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।
৫ বছর অন্তর বেতন-পেনশন সংশোধনের দাবি
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হল বেতন এবং পেনশন সংশোধনের সময়সীমা।
বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বেতন কমিশনের মাধ্যমে বেতন ও পেনশনের কাঠামো পর্যালোচনা করা হয়। BPS-এর দাবি, ১০ বছরের পরিবর্তে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বেতন ও পেনশন পর্যালোচনা করা হোক।
এর ফলে মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার খরচের পরিবর্তনের সঙ্গে বেতন ও পেনশনের কাঠামো আরও দ্রুত সামঞ্জস্য করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
কেন্দ্রীয় স্বশাসিত সংস্থার কর্মীদেরও একই সুবিধা
BPS-এর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন Central Autonomous Bodies বা CABs এবং Statutory Bodies-এর যোগ্য কর্মী ও পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ৮ম পে কমিশনের সুবিধা একই সময়ে কার্যকর করা হোক।
বর্তমান ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য DA বা DR সংক্রান্ত নির্দেশ জারি হওয়ার পরে CAB-এর ক্ষেত্রে আলাদা নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এই ব্যবধান দূর করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়াও BSNL-এর পেনশনভোগীদের পেনশন সমতা এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্যাগুলি সমাধানের দাবিও রয়েছে।
কবে থেকে ৮ম পে কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হবে?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; কবে থেকে বেতন বা পেনশন বাড়বে?
এখনই কোনও দিনক্ষণ বলা যাচ্ছে না। ৮ম পে কমিশন বিভিন্ন কর্মী, পেনশনভোগী এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মতামত ও প্রস্তাব সংগ্রহ করছে। আজ, ১০ অগাস্ট ২০২৬-এ কমিশনের দ্বিতীয় দফার মিটিং।
সমস্ত মতামত এবং তথ্য পর্যালোচনা করার পর কমিশন নিজেদের সুপারিশ তৈরি করবে। তার পর সেই সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যাবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরেই তা কার্যকর হওয়ার পথ তৈরি হবে।
তাই আপাতত ৬৯,০০০ টাকার মিনিমাম বেতন বা ৪৫,০০০ টাকার মিনিমাম পেনশন প্রস্তাবের পর্যায়েই আছে। এগুলি ফাইনাল বেতন বা পেনশন বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কারা এই প্রস্তাব দিল?
Bharat Pensioners Samaj ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত একটি পেনশনভোগীদের সংগঠন। সংগঠনটি কেন্দ্রীয় সরকারের Department of Pension & Pensioners’ Welfare এবং NITI Aayog-এর স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত। SCOVA-তেও তাদের প্রতিনিধি রয়েছে।
তাদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ২৪৫টি সংগঠন যুক্ত রয়েছে বলে দাবি সংস্থার।
ফলে ৮ম পে কমিশনের কাছে সংগঠন যে প্রস্তাবগুলি দিয়েছে, সেদিকেই তাকিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী এবং অবসরপ্রাপ্তরা। তবে শেষ পর্যন্ত কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে, কতটা বেতন বা পেনশন বাড়বে এবং নতুন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কত হবে, সবটাই নির্ভর করবে ৮ম পে কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের উপর।