
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, জুলাই মাস থেকে রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং এই কার্ডধারীরা দেশের যে কোনও প্রান্তে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। আয়ুষ্মান ভারত চালু করতে কেন্দ্র-রাজ্য 'মউ' স্বাক্ষর হয়েছে গত সোমবারই। এবার বাংলায় ধাপে ধাপে শুরু হয়ে যাবে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের কাজ। সেই অনুযায়ী ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর জন্য উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে এই কাজ শুরু হয়েছে। চলবে ২৫ জুন পর্যন্ত। সেজন্য গ্রুপ বি আধিকারিক এবং ফিল্ড লেভেল কর্মীদের নিয়োজিত করাও শুরু হয়েছে। প্রথম ধরনের আধিকারিকদের ‘ভেরিফিকেশন অফিসার’ বলা হচ্ছে।
২৫ জুনের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে
পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত–প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার জন্য উপভোক্তাদের গ্রাউন্ড লেভেল যাচাই ও ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকে । ২৫ জুনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি আয়ুষ্মান ভারত সংক্রান্ত এক নির্দেশনামায় উপভোক্তাদের তথ্য যাচাইয়ের কাজ শুরু হবে বলে জানান স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রধান সচিব। কলকাতা কর্পোরেশনের কমিশনার, সব জেলার জেলাশাসক এবং মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথাও জানানো হয় চিঠিতে। জেলায় জেলায় যেমন প্রয়োজন, তেমন আধিকারিক ও ফিল্ড কর্মীদের নিয়োগ করা যাবে বলেও জানান সচিব। এও জানিয়েছিলেন, আদর্শ সরকারি নিয়মাবলি মেনে গোটা কাজটি করতে হবে। সেই অনুযায়ী ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অ্যাক্ট (এনএফএসএ)-এর তথ্যভাণ্ডার ধরে ধরে উপভোক্তাদের নথি যাচাই শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রের খবর, প্রথমে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি রূপায়িত হবে। তারপর ধাপে ধাপে রাজ্যজুড়ে শুরু হবে। সরকারের কাছে থাকা তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে উপভোক্তার দেওয়া তথ্য মিলে গেলে ই-কেওয়াইসি (করা না-থাকলে) সেখানেই করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক স্তরে চূড়ান্ত তৎপরতা
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের উপভোক্তা বা বেনিফিশিয়ারি চিহ্নিতকরণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এই কাজের জন্য জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের (NFSA) অধীনস্থ ডেটাবেসকে মূল উৎস বা সোর্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই ডেটাবেসের আওতাভুক্ত অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (AAY), বিশেষ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত (SPHH) এবং অগ্রাধিকার প্রাপ্ত (PHH) রেশন কার্ড হোল্ডারদের তথ্য যাচাই করেই আয়ুষ্মান ভারতের উপভোক্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হবে। স্বাস্থ্য দফতরের মেমোতে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই কাজের জন্য কোনও রকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। বিশেষ করে, অন্নপূর্ণা অন্ত্যোদয় যোজনা, রাজ্যের গরিব মানুষ বা বিশেষ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত পরিবারের তালিকা তাঁদের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করার জন্য বলা হয়েছে। ৯ জুন থেকে রাজ্যজুড়ে উপভোক্তাদের ভেরিফিকেশন এবং ই-কেওয়াইসি (e-KYC) প্রক্রিয়া জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামী ২৫ জুনের মধ্যে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার কড়া ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ভবনের তরফে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পরিবার ১ কোটি ২৪ লক্ষ ১,৫৩০ এবং অন্নপূর্ণা অন্ত্যোদয় যোজনায় ১৬ লক্ষ ১৭ হাজার ৯০ জন রেশনের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা পান। প্রতিটি ব্লক ও পুরসভায় গ্রুপ-বি স্তরের অফিসার এবং ফিল্ড লেভেল কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করবেন। প্রতিদিনের অগ্রগতি জেলা স্তরে নজরদারির আওতায় রাখা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
কাজ নিখুঁত করতে স্বাস্থ্য ভবনের ৪ দফা কঠোর গাইডলাইন
প্রক্রিয়াটি যাতে এক্কেবারে মসৃণ ও দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে শেষ করা যায়, তার জন্য জেলা প্রশাসন ও পুরসভাকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১. গ্রুপ-বি অফিসারদের নজরদারি: ব্লক এবং পুরসভা স্তরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উপভোক্তা যাচাই করার জন্য ভেরিফিকেশন অফিসার এবং ফিল্ড লেভেল ওয়ার্কারদের (FLWs) মোতায়েন করা হচ্ছে। স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ভেরিফিকেশন অফিসারদের পদমর্যাদা কোনওভাবেই ‘গ্রুপ বি’ (Group B Officer) অফিসারের নিচে হওয়া চলবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে শেষ করতে কত সংখ্যক আধিকারিক লাগবে, তা ঠিক করবেন সংশ্লিষ্ট জেলার ডিএম-রা।
২. কঠোর এসওপি (SOP) পালন: ফিল্ড ভেরিফিকেশনের সমস্ত কাজ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের জারি করা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) মেনেই হবে।
৩. বকেয়া ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করা: ভেরিফিকেশন চলাকালীন যে সমস্ত যোগ্য উপভোক্তাদের নাম রেশনের ডেটাবেসে থাকা সত্ত্বেও ই-কেওয়াইসি (e-KYC) পেন্ডিং রয়েছে, তা সঙ্গে সঙ্গে অনস্পট সম্পন্ন করে নিতে হবে।
৪. ডিজিটাল পোর্টাল ও অ্যাপে রিয়েল-টাইম আপডেট: ভেরিফিকেশন টিমগুলিকে যোগ্য উপভোক্তাদের সঠিক সনাক্তকরণ ও যাচাইকরণের পর সংগৃহীত সমস্ত ডেটা এবং ফাইন্ডিংস অবিলম্বে সরকারের নির্দিষ্ট পোর্টাল কিংবা ডেসিগনেটেড মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমে আপডেট করতে হবে।
তবে অনেকেই জানেন না এই প্রকল্পের সুবিধা কী? কারা এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য আর কী ভাবেই বা যাচাই করা হচ্ছে যোগ্যতা? চলুন জেনে নেওয়া যাক, কারা আয়ুষ্মান কার্ড পেতে পারেন এবং কারা পারেন না?
আয়ুষ্মান কার্ড কী?
আয়ুষ্মান কার্ড হল ভারত সরকারের 'আয়ুষ্মান ভারত - প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা' (AB PM-JAY)-র অন্তর্গত একটি স্বাস্থ্য কার্ড। এই কার্ড থাকলে এর মাধ্যমে দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক পরিবার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ নাগরিকরা তালিকাভুক্ত হাসপাতালগুলি থেকে প্রতি বছর পরিবার প্রতি ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পেয়ে থাকেন।
আয়ুষ্মান কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা
আপনি যদি অসুস্থ হন এবং আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তাহলে আয়ুষ্মান কার্ড ব্যবহার করে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন। ভারত সরকার যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য আয়ুষ্মান কার্ড ইস্যু করে। এর সাহায্যে উপভোক্তারা বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন। এই প্রকল্পে সরকার রোগীর চিকিৎসার খরচ বহন করে, অর্থাৎ আপনাকে কোনও টাকা দিতে হয় না।
যোগ্যতার মানদণ্ড
আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে আপনি বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন।প্রত্যেক আর্থিক বছরের মধ্যে এই সময়সীমা গণনা করা হয়।সরকার প্রতি অর্থ বছরে আয়ুষ্মান কার্ডে ৫ লক্ষ টাকার একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়। আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে আপনি শুধুমাত্র এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হাসপাতালগুলিতেই বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে পারেন। এতে সরকারি ও অনেক বেসরকারি হাসপাতালও রেজিস্টার্ড রয়েছে। আপনি এই প্রকল্পের অফিসিয়াল লিঙ্ক https://hem.nha.gov.in/search-এর মাধ্যমে জেনে নিতে পারেন যে আপনার শহরের কোন হাসপাতালে আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যাবে।
কারা আয়ুষ্মান কার্ড তৈরি করাতে পারবেন?
১) অসংগঠিত খাতে কর্মরত ব্যক্তিরা
২) আপনি যদি তফসিলি জাতি বা তফসিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত হন
৩) গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ
৪) আপনি যদি দৈনিক মজুরি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন
৫) আপনার পরিবারের কারও যদি প্রতিবন্ধকতা থাকে
৬) যদি আপনি নিঃস্ব বা আদিবাসী হন
৭) যাঁদের বয়স ৭০ বছরের বেশি
কারা আয়ুষ্মান কার্ড তৈরি করতে পারবেন না?
১) যাঁরা ব্যবসা করেন
২) আপনি যদি সরকারি চাকরিতে থাকেন
৩) আপনি যদি সংগঠিত খাতে কাজ করেন
৪) যদি আপনার পিএফ কেটে নেওয়া হয়
৫) আপনি যদি ESIC-এর সুবিধা গ্রহণ করেন
৬) যদি আপনি কর ইত্যাদি পরিশোধ করেন