
বাংলায় শুরু হয়ে গিয়েছে আয়ুষ্মান যোজনা। বছরে ৫ লাখের ফ্রি চিকিৎসা পাবেন। জেনে নেওয়া যাক, কারা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন, কী কী চিকিৎসার খরচ মিলবে, কীভাবে আয়ুষ্মান কার্ড পাওয়া যাবে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে কী নিয়ম মানতে হবে।
আয়ুষ্মান যোজনায় পরিবারের সদস্য সংখ্যার কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। পরিবারে যত জন সদস্যই থাকুন না কেন, বয়স যতই হোক, সকলেই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন। একটা পরিবারের জন্য মোট স্বাস্থ্যবিমার কভার ৫ লক্ষ টাকা। ৭০ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ নাগরিকেরা চাইলে আলাদা করে কার্ড করাতে পারেন। তাঁদের ক্ষেত্রে আয়ের কোনও শর্ত নেই। এই স্কিমের জন্য কোনও প্রিমিয়াম দিতে হয় না। পুরোপুরি ফ্রি।
কারা আয়ুষ্মান কার্ড পাবেন?
২০১১ সালের সোশিও-ইকনমিক কাস্ট সেনসাস (SECC) অনুযায়ী, যে সমস্ত গ্রামীণ পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে রয়েছে, তারা এই স্কিমের সুবিধা পাবেন।
শহরাঞ্চলেও এই প্রকল্পের সুবিধা মিলবে। তবে সেখানে নির্দিষ্ট কিছু পেশার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের পরিবারই যোগ্য। শহরাঞ্চলে মোট ১১ ধরনের পেশার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের পরিবারের নাম এই তালিকায় রয়েছে। এছাড়াও ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যাঁদের আরএসবিওয়াই কার্ড ছিল, তাঁরাও এই স্কিমের জন্য যোগ্য।
কোন কোন রোগের চিকিৎসা এই স্কিমে?
চিকিৎসার সময় রোগীর জন্য একটি হেলথ প্যাকেজ বেছে নিতে হয়। সেই প্যাকেজের মোট খরচ ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে থাকলে রোগীকে কোনও টাকা দিতে হবে না। কিন্তু চিকিৎসার খরচ ৫ লক্ষ টাকার বেশি হলে অতিরিক্ত টাকা রোগীকেই বহন করতে হবে।
হার্টের অসুখে সার্জারি
ক্যানসার
স্নায়ুর রোগ
ব্রেন টিউমার
স্ট্রোক
কিডনি
লিভারের অসুখ (সিরোসিস)
হার্নদিয়া
ইউটিআই
শ্বাসকষ্টের সমস্যা (COPD)
নিউমোনিয়া
হাড়ের সার্জারি
স্ত্রী রোগ (ওভারি সিস্ট)
প্রসূতি (নরম্যান, সি সেকশন)
শিশুদের হার্টের অসুখ
কোন কোন চিকিৎসা হবে না?
ওপিডি
বাড়িতে চিকিৎসা
ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন
কসমেটিক সার্জারি
ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট
ইন্ডিভিজুয়াল ডায়াগনস্টিকস
অঙ্গ প্রতিস্থাপন
কখন খরচ?
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন দিন আগে এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৫ দিন পর্যন্ত ফলো-আপ কেয়ারের খরচও এই কভারের অন্তর্ভুক্ত।
হেলথ প্যাকেজ
প্রতিটি হেলথ প্যাকেজের নির্দিষ্ট মূল্য রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসার সময় যে সমস্ত খরচ হয়, সেগুলি হিসাব করেই প্যাকেজের দাম নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে
চিকিৎসকের কনসালটেন্সি ফি
ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা
মেডিক্যাল প্রসিডিওর
ওষুধ
স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রয়োজনীয় সামগ্রী
রুম চার্জ
সার্জনের চার্জ
ওটি চার্জ
আইসিইউ চার্জ
ফলো-আপ কেয়ারের খরচ
চিকিৎসা সম্পূর্ণ ক্যাশলেস
রোগীকে আগে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে পরে তা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা নেই। পুরোটাই ফ্রি। তবে শুধুমাত্র বাছাই করা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই।
পুরনো অসুখেও চিকিৎসা
আরও একটি সুবিধা হল, স্কিম প্রথম দিন থেকেই চালু হবে। মানে আগে থেকে থাকা রোগের চিকিৎসাও হবে। বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা সংস্থার ক্ষেত্রে যা পাওয়া যায় না।
কীভাবে আয়ুষ্মান কার্ড পাবেন?
যোগ্য সুবিধাভোগীদের একটি আয়ুষ্মান কার্ড দেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গেলে সেই কার্ড দেখাতে হবে। তবে কার্ড পাওয়ার জন্য প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে যে সুবিধাভোগীদের তালিকায় আপনার নাম রয়েছে কি না।
এজন্য beneficiary.nha.gov.in ওয়েবসাইটে যেতে হবে। ওয়েবসাইটের উপরে ডান দিকে লগ ইন অপশন। এরপর স্কিমের নাম, রাজ্য, সাব-স্কিম, জেলা এবং ‘Search By’-তে আধার নম্বর দিয়ে খোঁজ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনাও করাতে পারবেন এখানে।
কীভাবে আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড করবেন?
আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড করার জন্য অ্যাপ অথবা beneficiary.n.gov.in-এ যেতে হবে। তালিকায় আপনার নাম থাকলে নামের পাশে ‘One Family Found’ লেখা দেখা যাবে। সেখানে ক্লিক করলে পরিবারের সমস্ত সদস্যের বিস্তারিত তথ্যের একটি উইন্ডো খুলবে। সেখানেই পরিবারের Family ID পাওয়া যাবে।
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পৃথক আয়ুষ্মান কার্ড থাকবে। প্রত্যেক সদস্যের কার্ডের স্ট্যাটাসও দেখা যাবে। কারও নামের পাশে ‘Unidentified’ লেখা থাকলে বুঝতে হবে তাঁর আধার লিঙ্ক করা নেই। সে ক্ষেত্রে আধার লিঙ্ক করাতে হবে।
আবার স্ট্যাটাস কলামে ‘Not Generated’ লেখা থাকলে বুঝতে হবে ই-কেওয়াইসি এখনও হয়নি। ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করার পর সংশ্লিষ্ট সদস্যের কার্ড তৈরি হয়ে যাবে। পরে সেটি ডাউনলোড করা যাবে।
যাঁদের আধার ইতিমধ্যেই লিঙ্ক করা রয়েছে এবং কার্ড তৈরি হয়ে গিয়েছে, তাঁদের নামের পাশে ডাউনলোডের চিহ্ন দেখা যাবে।
সেখানে ক্লিক করলে আধার নম্বর দিয়ে অথেন্টিকেশন করতে হবে। এর পর তথ্য শেয়ার করার জন্য একটি কনসেন্ট ফর্ম খুলবে। সম্মতি দেওয়ার পর দু’টি ওটিপি দিতে হবে, একটি আধার ওটিপি, অন্যটি মোবাইল ওটিপি।
এর পর একটি নতুন উইন্ডো খুলবে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের কার্ড ডাউনলোড করার অপশন পাওয়া যাবে। যে সদস্যের কার্ড ডাউনলোড করতে চান, তাঁকে নির্বাচন করতে হবে। কার্ড ডাউনলোডের আগে আবারও অথেন্টিকেশন করতে হবে।
যাঁর কার্ড, তাঁর আধার নম্বর দিতে হবে। তাঁর ফোনে ফের দু’টি ওটিপি আসবে। দু’টি ওটিপি দেওয়ার পর ‘Card View’ অপশন দেখা যাবে। সেখান থেকেই কার্ড ডাউনলোড করা যাবে।
হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর আগে কী করবেন?
নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে প্রথমেই আয়ুষ্মান প্রকল্পের আওতায় থাকা হাসপাতাল খুঁজে নিতে হবে। সেই তালিকা hospital.pmjay.gov.in-এ পাওয়া যাবে। সেখানে ‘Find Hospitals’-এ ক্লিক করুন। এর পর রাজ্য, জেলা এবং হাসপাতালের ধরন নির্বাচন করতে হবে। হাসপাতাল হতে পারে সরকারি, বেসরকারি এবং অলাভজনক বেসরকারি। নিজের রোগ অনুযায়ী স্পেশালিটি নির্বাচন করুন।
হাসপাতালে কী কী লাগবে?
আইডি, আধার আইডি এবং আয়ুষ্মান কার্ড।
ক্লেমের প্রক্রিয়া কী?
প্রথমে নেটওয়ার্ক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে পরীক্ষা করবেন। রোগ নির্ণয় করা হবে। তারপর বিভিন্ন পরীক্ষা। রোগীর নাম তালিকায় রয়েছে কিনা দেখা হবে। নাম পাওয়া গেলে রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি হেলথ প্যাকেজ দেবে হাসপাতাল।
কোনও হেলথ প্যাকেজ ঠিক করার পর প্রি-অথরাইজেশন নিতে হয়। আয়ুষ্মান কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম ধাপ।
প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে আয়ুষ্মান মিত্র থাকেন। আবেদন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর।
আয়ুষ্মান মিত্র এবং টিপিএ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট এজেন্সি বা ISA-র কাছে পাঠাবেন।
আইএসএ একটি সরকারি সংস্থা। তারা নথিপত্র পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবে আবেদন অনুমোদন করা হবে কিনা।
আইএসএ-র অতিরিক্ত কোনও তথ্য প্রয়োজন হলে তা ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের কাছে চাওয়া হবে।
আবেদন অনুমোদন হবে না বাতিল হবে, সে বিষয়ে আইএসএ ৬ ঘণ্টার মধ্যে জানাবে।
তবে মনে রাখতে হবে, সার্জিক্যাল এবং নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা একসঙ্গে করা যাবে না। দু’টি চিকিৎসা আলাদা সময়ে করতে হবে। দু’টির জন্যই নতুন করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে অপারেশনের ক্ষেত্রে কী হবে?
ধরা যাক, পরিকল্পনা করে চিকিৎসা করানোর পরিবর্তে হঠাৎ কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হল। সে ক্ষেত্রে রোগী সরাসরি জরুরি বিভাগে হাসপাতালে পৌঁছবেন। মোটামুটি একই প্রক্রিয়া।
এক্ষেত্রে কাগজপত্রের জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি আইএসএ-র কাছ থেকে ফোনে অনুমোদন নেওয়া হয়।
কোনও প্রশ্ন বা সংশয় থাকলে ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের কাছে পাঠানো হবে। হাসপাতাল দ্রুত তার উত্তর দেবে। আবেদন পাওয়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যে আইএসএ সিদ্ধান্ত জানাবে, সেই রোগীর চিকিৎসা স্কিমের আওতায় পড়বে কিনা।
প্রি-অথরাইজেশন পাওয়ার পর কত দিন সময়?
ধরা যাক, আপনি প্রি-অথরাইজেশন পেয়ে গেলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করাতে চাইছেন না। কয়েক দিন পরে চিকিৎসা করাবেন। সেই ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রি-অপ্রুভাল ১৪ দিন পর্যন্ত বৈধ থাকে। আরও সময় প্রয়োজন হলে লিখিত আবেদন করে আরও ৭ দিনের এক্সটেনশন নেওয়া যায়।
কোন ক্ষেত্রে প্রি-অথরাইজেশন বাতিল?
পরীক্ষার রিপোর্ট নির্বাচিত হেলথ প্যাকেজের সঙ্গে মিলছে না।
প্রয়োজনীয় সাপোর্টিভ ডকুমেন্ট বা ক্লিনিক্যাল ডেটা ফর্ম জমা দেওয়া হয়নি।
আইএসএ কোনও প্রশ্ন পাঠানোর পর নেটওয়ার্ক হাসপাতাল তার উত্তর দেয়নি।
প্রয়োজনীয় রিপোর্ট কম্পিউটারাইজড নয়।
৭০ বছরের বেশি বয়সীদের পুরো ফ্রি
৭০ বছরের বেশি বয়সী সমস্ত প্রবীণ নাগরিক এই স্কিমের জন্য যোগ্য। তাঁদের জন্য আলাদা আয়ুষ্মান কার্ড দেওয়া হবে।
তাঁদের অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকার কভার থাকবে, যা শুধুমাত্র তাঁর নিজের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যাবে।
একটি পরিবারে ৭০ বছরের বেশি বয়সি একাধিক ব্যক্তি থাকলে তাঁদের চিকিৎসার জন্য ওই ৫ লক্ষ টাকার কভারই ব্যবহার করা হবে।
ধরা যাক, কোনও প্রবীণ নাগরিক যদি ইতিমধ্যেই CGHS, ECHS বা Ayushman CAPF-এর আওতায় আছেন। তিনি পুরনো স্কিমে থাকতে ছেড়ে আয়ুষ্মানে আসার সুযোগ পাবেন।
আবার কোনও প্রবীণের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও সুবিধা পেতে পারেন। এমনকি কেউ যদি ESIS-এর আওতায় থাকলেও।
প্রবীণ নাগরিকদের আবেদন কীভাবে?
যেতে হবে beneficiary.n.gov.in-এ।
নাম এনরোল করতে হবে। আধার কার্ডের মাধ্যমে কেওয়াইসি করুন।
কেওয়াইসি হয়ে গেলে আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড করা যাবে।
প্রত্যেক প্রবীণ নাগরিকের নিজস্ব পৃথক কার্ড থাকবে। ক্লেম করার প্রক্রিয়াও সাধারণ সুবিধাভোগীদের মতোই। শুধু কার্ডটি আলাদা।
তাই প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এনরোলমেন্ট করা জরুরি। কার্ড হাতে পাওয়ার পরই তাঁরা চিকিৎসার জন্য যোগ্য হয়ে যাবেন।
অভিযোগ বা সমস্যা হলে কী করবেন?
শুধু রোগীই নন, আয়ুষ্মান মিত্র বা স্কিমের সঙ্গে যুক্ত যে কোনও ব্যক্তি সমস্যার সম্মুখীন হলে কল সেন্টারে অভিযোগ জানাতে পারেন।
হেল্পলাইন নম্বর ১৪৫। ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন চালু থাকে। সম্পূর্ণ টোল-ফ্রি। মানে ফোন করে অভিযোগ জানাতে কোনও টাকা খরচ হবে না। এছাড়া ১৮০০১৫৬৫ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
অনলাইনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে অফলাইনেও অভিযোগের চিঠি পাঠানো যায়।
অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য জাতীয়, রাজ্য এবং জেলাস্তরে কমিটি রয়েছে।
অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে জানা যাবে, আপনার অভিযোগটি কে দেখছেন এবং তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের স্ট্যাটাস অনলাইনেই ট্র্যাক করা যাবে।
যে ব্যক্তি বা সংস্থা অভিযোগের দায়িত্বে থাকবে, তাকে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কমিটির সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে।
আর কমিটির সিদ্ধান্ত ৩০ দিনের মধ্যে কার্যকর না করলে জরিমানার ব্যবস্থাও রয়েছে।