
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সোনা ও রুপোর দাম সর্বকালীন রেকর্ড ছুঁয়েছে। বাজারে এই আকাশছোঁয়া দামের কারণে লগ্নিকারীদের কাছে মূল্যবান এই ধাতুগুলি আগের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে, চিরাচরিত প্রথায় কেবল গয়না বা সোনার বিস্কুট কিনে লকারে তুলে রাখার দিন এখন অতীত। আধুনিক অর্থনীতিতে এমন বেশ কিছু উপায় রয়েছে, যেখানে সোনায় বিনিয়োগ করলে শুধু দারুণ রিটার্নই মিলবে না, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আয়করও বাঁচানো সম্ভব।
সর্বাধিক কর সাশ্রয় করতে ২০২৬ সালে সোনায় কীভাবে বিনিয়োগ করবেন? জেনে নিন সবিস্তারে।
আয়করের নিয়মাবলি: শর্ট টার্ম নাকি লং টার্ম?
সোনা বা রুপো বিক্রি করে যে মুনাফা হয়, আয়করের ভাষায় তাকে 'মূলধনী লাভ' বা ক্যাপিটাল গেইনস (Capital Gains) বলা হয়। আপনি কতদিন সেই বিনিয়োগ ধরে রাখছেন (Holding Period), মূলত তার ওপর ভিত্তি করেই করের হার নির্ধারিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী লাভ (LTCG): নির্দিষ্ট মেয়াদের পর বিনিয়োগ ভাঙালে ইনডেক্সেশনের সুবিধা ছাড়াই লাভের ওপর মাত্র ১২.৫% হারে কর দিতে হয়।
স্বল্পমেয়াদী মূলধনী লাভ (STCG): নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে বিনিয়োগ বিক্রি করলে আপনার নিজস্ব আয়করের স্ল্যাব (যেমন ২০% বা ৩০%) অনুযায়ী কর ধার্য হবে।
কোন খাতে কতদিন বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে?
২৪ মাস: ফিজিক্যাল সোনা, ডিজিটাল সোনা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে।
১২ মাস: গোল্ড ইটিএফ (ETF) এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে ট্রেড হওয়া সভরেন গোল্ড বন্ডের (SGB) ক্ষেত্রে।
সোনায় বিনিয়োগের সেরা বিকল্প
১. গোল্ড ইটিএফ (Gold ETF): কর বাঁচানোর ব্রহ্মাস্ত্র
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সোনায় বিনিয়োগের অন্যতম সেরা এবং কর-সাশ্রয়ী উপায় হল ইটিএফ। এটি সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে কেনা বেচা করা যায় বলে এতে তারল্য বা লিক্যুইডিটি (Liquidity) প্রচুর। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এতে গয়নার মতো কোনও জিএসটি (৩%) বা মেকিং চার্জ দিতে হয় না। ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট থাকলে সহজেই ইটিএফ কেনা যায়। করের দিক থেকেও এটি লাভজনক, কারণ মাত্র ১২ মাস ধরে রাখলেই এটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ বা এলটিসিজি হিসেবে গণ্য হয় এবং লাভের ওপর মাত্র ১২.৫% কর দিতে হয়।
২. সভরেন গোল্ড বন্ড (SGB): সেকেন্ডারি মার্কেটের সুযোগ
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গ্যারান্টিযুক্ত এই বন্ডগুলি মেয়াদ পূর্তি পর্যন্ত ধরে রাখলে মূলধনী লাভের ওপর এক টাকাও কর দিতে হয় না, সঙ্গে মেলে বার্ষিক ২.৫% নিশ্চিত সুদ। ২০২৫ সালের বাজেটে সরকার নতুন বন্ড ইস্যু করা বন্ধ করে দিলেও, পুরনো বন্ডগুলি এখনও শেয়ার বাজারের সেকেন্ডারি মার্কেটে দেদার কেনাবেচা হচ্ছে। বাজার থেকে কিনে ১২ মাস এই বন্ড ধরে রাখলে ১২.৫% এলটিসিজি নিয়মের সুবিধাও পাওয়া যায়।
৩. গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড: ডিম্যাট ছাড়াই আধুনিক লগ্নী
যাঁদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট নেই, তাঁদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ড দারুণ বিকল্প। এই ফান্ডগুলি বিনিয়োগকারীদের টাকা মূলত গোল্ড ইটিএফ-এ খাটায়। তবে করের ক্ষেত্রে এর নিয়ম কিছুটা আলাদা। দীর্ঘমেয়াদী করের (১২.৫%) সুবিধা পেতে হলে এই ফান্ডের বিনিয়োগ অন্তত ২৪ মাস ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি, এতে এক্সপেন্স রেশিও বা পরিচালন ফি থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
৪. ফিজিক্যাল ও ডিজিটাল সোনা
গয়না বা কয়েন কেনা সবচেয়ে পুরনো চল, আর ডিজিটাল সোনা এখন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু কর বাঁচানোর দিক থেকে এগুলি খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ, কেনার সময়েই সরাসরি ৩% জিএসটি (গয়নার ক্ষেত্রে মজুরির ওপর অতিরিক্ত জিএসটি) পকেট থেকে বেরিয়ে যায়। উপরন্তু, দীর্ঘমেয়াদী করের সুবিধা পেতে হলে এই বিনিয়োগ অন্তত ২৪ মাস আটকে রাখতে হয়।
কর সাশ্রয়ের অব্যর্থ কৌশল
সোনার বাজার থেকে মুনাফার অঙ্ক বাড়াতে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া এই তিনটি কৌশল মাথায় রাখতে পারেন:
লং-টার্মের সুবিধা নিন: বিনিয়োগ এমনভাবে পরিকল্পনা করুন যাতে তা অন্তত ১২ বা ২৪ মাসের গণ্ডি পার করে। ৩০% আয়কর স্ল্যাবের আওতায় থাকা বিনিয়োগকারীরা শর্ট-টার্মের বদলে ১২.৫% লং-টার্ম করের সুবিধা নিলে রিটার্নের পরিমাণ একধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যায়।
ট্যাক্স লস হারভেস্টিং: শেয়ার বাজার বা ইক্যুইটিতে যদি আপনার কোনও লোকসান হয়ে থাকে, তবে সোনা বিক্রি করে পাওয়া লাভের অঙ্কের সঙ্গে তা অ্যাডজাস্ট (Set Off) করে নিতে পারেন। এতে আপনার মোট করযোগ্য আয় অনেকটাই কমে যাবে।
অহেতুক মাশুল এড়ান: গয়না বা ফিজিক্যাল সোনার বদলে ইটিএফ বা গোল্ড ফান্ডের দিকে ঝুঁকুন। জিএসটি, মেকিং চার্জ বা লকার ভাড়ার মতো খরচগুলি বাঁচাতে পারলেই আপনার বিনিয়োগের আসল লাভ ঘরে আসবে।
নিরাপদ বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতি (Inflation) মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে সোনা চিরকালই ভারতীয়দের কাছে পয়লা নম্বরে। তবে পরিবর্তিত কর ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ রিটার্ন পেতে হলে কেবল আবেগ দিয়ে সোনা কিনলে চলবে না, আধুনিক ও হিসেবি বিনিয়োগ কৌশল বেছে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।