
রাস্তায় নিজের পছন্দের গাড়ি বা বাইক নিয়ে বেরনোর স্বপ্ন তো অনেকেই দেখেন, কিন্তু তার জন্য আপনার কাছে একটি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকাটা বাধ্যতামূলক। এটি শুধু আপনার গাড়ি চালানোর আইনি অধিকারেরই প্রমাণ নয়, নতুন গাড়ি কিনতেও এর প্রয়োজন হয়। তবে, কোন যানের জন্য ঠিক কেমন লাইসেন্স দরকার এবং অনলাইনে কীভাবে এর আবেদন করতে হয়, তা নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। জেনে নিন, পশ্চিমবঙ্গে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার বিস্তারিত পদ্ধতি।
লাইসেন্স মূলত কয় প্রকারের হয়?
মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে ড্রাইভিং লাইসেন্সকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায়:
লার্নার্স লাইসেন্স (LL): এটি একটি সাময়িক লাইসেন্স। এই লাইসেন্স প্রমাণ করে যে আপনি গাড়ি চালানো শিখছেন। লার্নার্স থাকলে একা গাড়ি চালানো যায় না, পাশে একজন পাকা লাইসেন্সধারী চালক থাকা বাধ্যতামূলক। এই লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে ৬ মাস। তবে এটি পাওয়ার অন্তত ১ মাস পর আপনি স্থায়ী লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
স্থায়ী লাইসেন্স (DL): লার্নার্স লাইসেন্স পাওয়ার পর, আপনার গাড়ি চালানোর হাত পাকলে স্থায়ী লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, লার্নার্সের মেয়াদ ফুরনোর (৬ মাস) আগেই যেন স্থায়ী লাইসেন্সের আবেদনটি সেরে ফেলেন।
গাড়ির ধরন অনুযায়ী লাইসেন্সের বিভাগ
আপনি কী ধরনের যান চালাবেন, তার ওপর ভিত্তি করে লাইসেন্স আলাদা হয়। যেমন:
গিয়ারবিহীন মোটরসাইকেল (MCWOG): স্কুটি বা মোপেডের মতো গিয়ারবিহীন দু'চাকার যানের জন্য।
গিয়ারযুক্ত মোটরসাইকেল (MCWG): সাধারণ মোটরসাইকেল বা বাইকের জন্য (এর সঙ্গে গিয়ারবিহীন যানও চালানো যায়)।
হালকা মোটর যান (LMV): ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গাড়ি, জিপ বা এসইউভি-র লাইসেন্স। তবে ট্যাক্সি বা ক্যাব চালাতে চাইলে LMV-TR লাইসেন্স লাগবে।
পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যান: পিক-আপ ভ্যান বা ছোট ম্যাটাডোরের জন্য হালকা পণ্যবাহী যান (LGV), ভারী ট্রাকের জন্য ভারী পণ্যবাহী যান (HGV), এবং বাস বা বাণিজ্যিক যানের জন্য যাত্রীবাহী যানের (MPV/HPV) লাইসেন্স নিতে হয়।
এছাড়াও, বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য কাস্টমাইজড গাড়ির লাইসেন্স (Invalid Carriage License) এবং বিদেশে গাড়ি চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিটের (IDP) ব্যবস্থাও রয়েছে।
অনলাইনে আবেদনের যোগ্যতা
বয়স: ব্যক্তিগত বা নন-ট্রান্সপোর্ট যান চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। বাণিজ্যিক বা ট্রান্সপোর্ট যানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ২০ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক।
লার্নার্স লাইসেন্স: নতুন চালকদের ক্ষেত্রে স্থায়ী লাইসেন্সের আগে একটি বৈধ লার্নার্স লাইসেন্স থাকা আবশ্যিক।
বাসিন্দা: আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
কী কী নথি বা ডকুমেন্ট লাগবে?
আবেদন করার আগে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় নথি হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন:
বয়সের প্রমাণপত্র: বার্থ সার্টিফিকেট, প্যান কার্ড, আধার কার্ড, পাসপোর্ট অথবা স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট।
ঠিকানার প্রমাণপত্র: আধার কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, আপনার নামে থাকা ইলেকট্রিক বা জলের বিল, অথবা ভাড়ার চুক্তিপত্র। (বয়স ও ঠিকানার প্রমাণের জন্য দু'টি আলাদা নথি দেওয়াই শ্রেয়)।
ছবি: সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
সরকারি ফর্ম: ৫০ বছরের কম বয়সিদের জন্য ফর্ম ১ এবং ৫০-এর বেশি হলে ফর্ম ১এ। পাশাপাশি ফর্ম ২ ও ৩ (লার্নার্সের জন্য)।
খরচের খুঁটিনাটি
লাইসেন্স তৈরির জন্য সরকারের নির্দিষ্ট কিছু ফি রয়েছে:
লার্নার্স লাইসেন্স ইস্যু (প্রতিটি ক্যাটেগরি): ১৫০ টাকা
লার্নার্স লাইসেন্স টেস্ট ফি: ৫০ টাকা
ড্রাইভিং লাইসেন্স টেস্ট ফি (প্রতি ক্যাটেগরি): ৩০০ টাকা
স্মার্ট কার্ড ফি (ফর্ম ৭): ২০০ টাকা
লাইসেন্স ইস্যু করার ফি: ২০০ টাকা
সার্ভিস চার্জ: ৬০ টাকা (উল্লেখ্য, পরীক্ষায় ফেল করলে বা লার্নার্সের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে পুনরায় ফি জমা দিয়ে টেস্ট দিতে হয়।)
কীভাবে অনলাইনে আবেদন করবেন?
পশ্চিমবঙ্গে এখন ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন প্রক্রিয়াটি অনেকটাই সহজ ও ডিজিটাল হয়ে গিয়েছে। এক নজরে দেখে নিন ধাপগুলি:
১. প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ দফতরের সরকারি ওয়েবসাইট বা 'পরিবহণ' (Parivahan) পোর্টালে যান।
২. ওয়েবসাইটের "Apply Online" অপশন থেকে "New Driving License" বেছে নিন।
৩. স্ক্রিনে আসা নির্দেশিকা মেনে নির্ভুলভাবে আবেদনপত্রটি (Application form) পূরণ করুন।
৪. আপনার ঠিকানা ও পরিচয়ের প্রমাণপত্র এবং ছবি স্ক্যান করে পোর্টালে আপলোড করুন।
৫. এরপর প্র্যাকটিক্যাল টেস্ট বা পরীক্ষার জন্য আপনার সুবিধামতো একটি তারিখ ও সময় (Slot Booking) বেছে নিন।
৬. অনলাইনেই নির্দিষ্ট ফি জমা করুন।
৭. বুক করা দিনটিতে নির্দিষ্ট আরটিও (RTO) কেন্দ্রে গিয়ে ড্রাইভিং টেস্ট দিন।
৮. পরীক্ষায় সফল হলে আপনার আবেদন মঞ্জুর হবে এবং কিছুদিনের মধ্যেই স্পিড পোস্টের মাধ্যমে আপনার ঠিকানায় স্থায়ী স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স পৌঁছে যাবে।