
যখনই বিশ্ব অর্থনীতি কোনও সঙ্কেটের মুখোমুখি হয়, মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয় এবং শেয়ার বাজারে বিক্রির হিড়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সকলের দৃষ্টি সোনা ও রুপোর দিকে ফেরে। বর্তমান পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে। যেখানে মুদ্রাস্ফীতি তুঙ্গে এবং বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো সুদের হার বাড়াচ্ছে, সেখানে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সোনা ও রুপার দাম গত ১০ মাস ধরে ক্রমাগত কমছে এবং সংশোধিত হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রুপোর দাম প্রতি কেজিতে ৪.২০ লক্ষ টাকা এবং সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১.৯১ লক্ষ টাকার রেকর্ড ছুঁয়েছিল, যা আজ কমে প্রায় ১.৯১ লক্ষ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে প্রায় ১.৪২ লক্ষ টাকায় রয়েছে।
গত বছর সোনা ও রুপোর দামে একতরফা ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল। তবে, গত ১০ মাসের তীব্র দরপতন অনেক ছোট-বড় বিনিয়োগকারীকে উদ্বিগ্ন করেছে, যারা সম্প্রতি সোনা ও রুপোকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এতে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এখন, এই অব্যাহত দরপতন বিনিয়োগকারীদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে, এই সঙ্কটকালে সোনা ও রুপো কি আবারও সুরক্ষা দেবে, নাকি এগুলো থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়?
ইতিহাসের পাতা থেকে
ইতিহাস সাক্ষী যে, যখনই বিশ্বের কাগজের মুদ্রা, শেয়ার বাজার বা রিয়েল এস্টেটের দাম কমেছে, মূল্যবান ধাতুগুলো বিনিয়োগকারীদের সম্পদকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে। ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক সঙ্কটের সময়, যখন বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজার ৫০% পর্যন্ত ধসে পড়েছিল, তখন সোনা পরবর্তী তিন বছরে বিনিয়োগকারীদের ১০০%-এরও বেশি শক্তিশালী রিটার্ন এনে দিয়েছিল। এমনকি ২০২০ সালে যখন কোভিড মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল, তখনও সোনা ও রুপো নতুন রেকর্ড গড়েছিল এবং পোর্টফোলিওকে শক্তিশালী করেছিল।
জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এত বড় পতনের কারণ কী?
এখন প্রশ্ন ওঠে: যদি সোনা ও রুপো সঙ্কটের সময়ে একে অপরের সঙ্গী হয়, তবে গত ১০ মাস ধরে এদের দাম কমছে কেন? এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে বলে মনে হয়।
১. কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর নীতি কঠোর করা
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে সুদের হার বাড়িয়েছে। যখন বন্ডের লভ্যাংশ এবং ব্যাঙ্ক ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের হার বাড়ে, তখন সুদবিহীন ধাতুর চাহিদা সাময়িকভাবে কমে যায়। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে।
২. মুনাফা নথিভুক্তকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ও রুপো মার্কিন ডলারে লেনদেন হয়। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রায় মূল্যবান ধাতু কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে এবং চাহিদা কমে যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তখন বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা উল্লেখযোগ্য মুনাফা তুলে নিয়েছিল, যা বাজারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। সাম্প্রতিক দরপতন প্রমাণ করেছে যে বাজার যেমনই হোক না কেন, একমুখী তেজিভাব কখনও স্থায়ী হয় না। গত বছর, সোনা ও রুপোর দাম মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল।
এই দরপতন কি কেনার সুযোগ?
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে সোনা ও রুপোর দামের এই পতন কোনো সঙ্কটের লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি প্রযুক্তিগত সংশোধন। রুপো তার সর্বকালের সর্বোচ্চ দাম থেকে প্রায় ৫৪% কমেছে। প্রযুক্তিগতভাবে, বাজার বর্তমানে চরম অতিবিক্রয়ের (Oversoldness) অবস্থায় রয়েছে। রুপো শুধু গয়না বা মুদ্রার পডাক্ট নয়। এটি সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের মেরুদণ্ড। সবুজ শক্তি এবং ই-যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ভবিষ্যতে রুপোর দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত ঊর্ধ্বগতির কারণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?
দামের সর্বনিম্ন স্তরটি ধরতে পারা প্রায় অসম্ভব। এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে যদি আপনি আপনার পোর্টফোলিওতে সোনা ও রুপোর বিনিয়োগ বাড়াতে চান, তবে এককালীন বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিবর্তে সুশৃঙ্খল কৌশল অবলম্বনের কথা বিবেচনা করুন। আপনার পোর্টফোলিওর ১৫% মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ করুন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল হলো ৭০% সোনায় এবং ৩০% রুপোয় বিনিয়োগ করা।
এককালীন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পরিহার করুন। প্রতি মাসে অথবা দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলে SIP-র মাধ্যমে সিলভার ETF বা গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড কিনুন। যদি আপনার ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হয়, তবে এখন ২৫% বিনিয়োগ করুন এবং বাকি ৭৫% আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে কিস্তিতে ভাগ করে দিন।
সোনা ও রুপো কি আবার সহায়ক শক্তি হয়ে উঠবে?
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই মন্দার মাঝে, চিনসহ বিশ্বের প্রধান দেশগুলো সোনা কিনছে, কারণ তারা বুঝতে পারছে যে বর্তমান এই অর্থনৈতিক সঙ্কট একটি সুযোগও বটে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শেয়ার বাজারের ওঠানামা এবং মুদ্রাস্ফীতির এই যুগে, সোনা আপনার পোর্টফোলিওতে স্থিতিশীলতা আনবে, অন্যদিকে রুপো সঠিক সময়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার ঘটিয়ে আপনার পোর্টফোলিওতে আরো মুনাফা এনে দেবে।
তবে, ইতিহাস কেবল সান্ত্বনা দিতে পারে, বর্তমান পোর্টফোলিওর ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে পারে না। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত, কারণ বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তবে, এই মন্দার সময়ে আতঙ্কিত হয়ে আপনার হোল্ডিং বিক্রি করে দেওয়া বা পরিত্যাগ করা গুরুতর ভুল হবে। মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব প্রতিহত করার জন্য এর চেয়ে ভালো এবং পরীক্ষিত কোনও অস্ত্র নেই। কিছু আর্থিক বিশেষজ্ঞের মতে, গত ১০ মাস ধরে সোনা ও রুপোর দামে যে পতন অব্যাহত রয়েছে তা কোনও বিপর্যয় নয়, বরং বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের দেওয়া একটি ছাড়ের প্রস্তাব। ভয় না পেয়ে ধৈর্য ধরে সঠিক কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।