
কৃষক বন্ধু প্রকল্প এবং কেন্দ্রের PM-KISAN সম্মান নিধি এখন গুগলে ট্রেন্ডিং। আর তা হবে না-ই বা কেন। দু’ই প্রকল্পেই কৃষকদের বেশ মোটা অঙ্কের আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। দু'টির নিয়ম, যোগ্যতা, টাকার পরিমাণ এবং আবেদনের পদ্ধতি এক নয়। ফলে অনেক কৃষকের মনেই প্রশ্ন; কৃষক বন্ধু এবং PM-KISAN কি একই প্রকল্প? কোনটিতে কত টাকা পাওয়া যায়? কারা আবেদন করতে পারবেন? কী কী নথি লাগবে?সহজ ভাষায় বললে, কৃষক বন্ধু হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকল্প। অন্য দিকে PM-KISAN চালায় কেন্দ্রীয় সরকার। যোগ্যতার নিয়ম মেনে একজন কৃষক দুই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের শর্ত পূরণের উপর নির্ভর করে। তাই দুই প্রকল্পের নিয়ম আলাদা করে জানা জরুরি।
কৃষক বন্ধুতে কত টাকা পাওয়া যায়?
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্পে কৃষকদের জমির পরিমাণের ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এক একর বা তার বেশি জমি থাকলে বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাবেন। সাধারণত এই টাকা দু’টি কিস্তিতে দেওয়া হয়।
যাঁদের জমির পরিমাণ এক একরের কম, তাঁরাও প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ অনুযায়ী আনুপাতিক হারে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
অর্থাৎ, কৃষক বন্ধু প্রকল্পে জমির পরিমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কৃষকের নামে থাকা জমির তথ্য যাচাই করেই প্রকল্পে কত টাকা পাবেন, তা স্থির করা হয়।
কৃষক বন্ধুতে আরও একটি বড় সুবিধা
শুধু চাষের জন্য আর্থিক সহায়তাই নয়। কৃষক বন্ধু প্রকল্পে নথিভুক্ত কৃষকের পরিবারের জন্য মৃত্যুকালীন আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি নথিভুক্ত কৃষকের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে এককালীন ২ লক্ষ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এটি এক ধরনের লাইফ ইনস্যুওরেন্সের মতো।
PM-KISAN-এ কত টাকা?
এ বার আসা যাক কেন্দ্রের PM-KISAN বা প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পে। এই প্রকল্পে যোগ্য জমি মালিক কৃষক পরিবারকে বছরে মোট ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
এই ৬ হাজার টাকা একসঙ্গে দেওয়া হয় না। বছরে তিনটি কিস্তিতে, অর্থাৎ প্রতি চার মাস অন্তর ২ হাজার টাকা করে কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
এই প্রকল্পের টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছনোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে PM-KISAN-এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষকে প্রকল্পের বাইরে রাখা হয়েছে। তাই শুধু জমি থাকলেই প্রত্যেকে এই প্রকল্পের টাকা পাবেন; এমনটা নয়।
এ ক্ষেত্রে e-KYC সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় যাচাই এবং সরকারি তথ্যের সঙ্গে নথির মিল না থাকলে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
কৃষক বন্ধু ও PM-KISAN-এর মূল পার্থক্য কোথায়?
দুই প্রকল্পের নাম আলাদা হলেও কৃষকদের আর্থিক সাহায্য করাই দু’টির মূল উদ্দেশ্য। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
কৃষক বন্ধু হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকল্প। অন্যদিকে PM-KISAN হল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প। কৃষক বন্ধুতে জমির পরিমাণ অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার হিসাব করা হয়। PM-KISAN-এ যোগ্য কৃষক পরিবারকে বছরে নির্দিষ্ট ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
কৃষক বন্ধু প্রকল্পে কৃষকের মৃত্যুর পরে পরিবারের জন্য ২ লক্ষ টাকার এককালীন সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। PM-KISAN-এর মূল সুবিধা হল বছরে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বারে বারে টাকা দেওয়া হয়।
তাই কোনও কৃষক দুই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারবেন কি না, তা সম্পূর্ণ জমির পরিমাণ ও অন্যান্য় শর্তের উপর নির্ভর করছে।
কৃষক বন্ধুতে কীভাবে আবেদন করবেন?
কৃষক বন্ধু প্রকল্পের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারি দফতরেও গিয়ে এ বিষয়ে দেখা করতে পারেন। নিজে ইন্টারনেটে সরগড় না হলে লোকাল সাইবার ক্যাফে গিয়ে তাঁদের সাহায্য নিতে পারেন।
আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত কৃষকের পরিচয়, জমির মালিকানা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে;
1. ভোটার পরিচয়পত্র
2. জমির নথি বা পর্চা
3. ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য বা পাসবুক
4. মোবাইল নম্বর
5. ছবি
6. আধার-সংক্রান্ত তথ্য
তবে আবেদনের সময় সংশ্লিষ্ট দফতর যে নথি চাইবে, সেটিই ফাইনাল। কোনও নথিতে ভুল থাকলে পরবর্তী সময়ে ভেরিফিকেশনের সময় সমস্যা হতে পারে।
PM-KISAN-এ কীভাবে আবেদন করবেন?
PM-KISAN-এর জন্য অনলাইনে নতুন কৃষক নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে। PM-KISAN-এর সরকারি পোর্টালে ‘Farmer Corner’ থেকে নতুন কৃষক রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা যায়।
এ ক্ষেত্রে আধার, মোবাইল নম্বর, জমির তথ্য এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মতো প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়। অনলাইনে আবেদন করার পর প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি দফতরের অফিসে যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
যাঁরা নিজেরা অনলাইনে আবেদন করতে পারেন না, তাঁরা নিকটবর্তী কমন সার্ভিস সেন্টার বা অনলাইন পরিষেবা কেন্দ্রের সাহায্য নিতে পারেন।
কৃষক বন্ধুতে ভেরিফিকেশন চলছে
কৃষক বন্ধু প্রকল্পে ইতিমধ্যেই সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই বা ভেরিফিকেশন নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। এই যাচাইয়ের মূল উদ্দেশ্য হল প্রকল্পের তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের নাম রাখা এবং ভুল বা ভুয়ো তথ্যের ভিত্তিতে কেউ যাতে সুবিধা না পান, তা নিশ্চিত করা।
কোনও কৃষক মারা গেলে তাঁর নাম তালিকায় থেকে গিয়েছে কি না, জমির তথ্য ঠিক রয়েছে কি না এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যুক্ত রয়েছে কি না; এ ধরনের বিষয়ও যাচাই করা হতে পারে।
সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এই ধরনের তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই জমি, ভুল নথি বা পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে কোনও অনুপযুক্ত ব্যক্তি যাতে সুবিধা না পান, তা নিশ্চিত করাই ভেরিফিকেশনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভেরিফিকেশনে কোন নথি লাগতে পারে?
কৃষক বন্ধু ভেরিফিকেশনের সময় কৃষকদের প্রয়োজনীয় নথি সঙ্গে রাখতে বলা হতে পারে। সাধারণ ভাবে যে নথিগুলি প্রয়োজন হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে;
আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক পাসবুক, জমির বর্তমান পর্চা এবং পুরনো জমির নথি।
এ ছাড়াও জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হতে পারে। কোনও কৃষকের জমির তথ্য সরকারি রেকর্ডে যে ভাবে রয়েছে, তাঁর দেওয়া নথির সঙ্গে সেটি মিলছে কি না, সেটিও দেখা হবে।
বিশেষ করে ২০১৯ সালের জমির পর্চা এবং বর্তমান পর্চা চাওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তাই কৃষকদের আগেভাগেই নিজেদের জমির নথি গুছিয়ে রাখা ভাল।
বাংলারভূমির তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে
ভেরিফিকেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ জমির তথ্য যাচাই। কৃষক যে জমির তথ্য দিয়েছেন, সেই জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর বা মালিকানার তথ্য সরকারি ‘বাংলারভূমি’ রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে।
নথিতে তথ্যের অমিল থাকলে কৃষককে সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতে পারে। তাই জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পরিবর্তন বা জমির রেকর্ডে কোনও সংশোধন হয়ে থাকলে সেই তথ্য ঠিকঠাক রয়েছে কি না, আগে দেখে নেওয়া ভাল।
আধার, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও নজর
শুধু জমির নথি নয়, কৃষকের আধার এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও যাচাই করা হতে পারে। কৃষকের নাম, আধার নম্বর এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যের মধ্যে কোনও অমিল থাকলে টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই Aadhaar Seeding বা e-KYC-এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সক্রিয় কি না এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সেটি যুক্ত রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা দরকার।
কোথায় কৃষক বন্ধু ভেরিফিকেশন করবেন?
কৃষক বন্ধু প্রকল্পের তথ্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্লক কৃষি আধিকারিকের দফতরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। ব্লক স্তরের কৃষি দফতর বা Assistant Director of Agriculture-এর অফিসে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে যেতে হতে পারে।
গ্রামীণ এলাকার কৃষকদের সুবিধার জন্য পঞ্চায়েত এলাকাতেও বিশেষ শিবিরের মাধ্যমে নথি সংগ্রহ এবং যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে। ফলে প্রত্যেক কৃষককে নিজের এলাকার কৃষি দফতর বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময় ও জায়গার তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।
নতুন আবেদন কবে শুরু হতে পারে?
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, অগাস্টের শেষের দিকে কৃষক বন্ধু এবং PM-KISAN-এর সুবিধা পাওয়ার জন্য নতুন আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট তারিখ ও নিয়ম সরকারি ভাবে জানানো হলে সেটিই ফাইনাল বলে ধরা হবে।
আবেদন অনলাইনের পাশাপাশি জনকল্যাণ শিবিরের মাধ্যমেও করার সুযোগ থাকতে পারে। তাই কৃষকদের অযথা কোনও ব্যক্তি বা দালালের উপর নির্ভর না করে সরকারি দফতর এবং সরকারি পোর্টালের তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, কৃষক বন্ধু এবং PM-KISAN একই প্রকল্প নয়। একটি রাজ্য সরকারের এবং অন্যটি কেন্দ্রের। টাকার পরিমাণ, কিস্তির নিয়ম, যোগ্যতা এবং সুবিধার ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। আবার কৃষক বন্ধু প্রকল্পের বর্তমান সুবিধাভোগীদের জন্য নথি যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ। তাই জমির পর্চা, আধার, ভোটার কার্ড, ব্যাঙ্ক পাসবুক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি ঠিকঠাক রাখা জরুরি। কোনও তথ্য ভুল থাকলে সময়মতো সংশ্লিষ্ট কৃষি দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।