
রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য চালু থাকা জনপ্রিয় দুই সরকারি প্রকল্পের নাম সম্প্রতী পরিবর্তন করেছে রাজ্য সরকার। 'কন্যাশ্রী' প্রকল্পের নতুন নাম হচ্ছে 'কন্যারত্ন'। অন্যদিকে, স্কুলপড়ুয়াদের সাইকেল প্রদানের সুপরিচিত প্রকল্প 'সবুজ সাথী'-র নাম বদলে রাখা হচ্ছে 'সারথী'। তবে নাম পরিবর্তন হলেও প্রকল্পগুলির সুবিধা বন্ধ হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য চালু থাকা সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আগের মতোই বহাল থাকবে। শুভেন্দুর বক্তব্য, 'প্রতি বছর ১৪ অগাস্ট রাজ্য জুড়ে যে ভাবে ‘কন্যাশ্রী দিবস’ উদ্যাপন করা হত, সেই ধারা আগামী দিনেও বজায় থাকবে। তবে এ বার থেকে তা নতুন পরিচয় নিয়ে ‘কন্যারত্ন দিবস’ হিসেবে পালিত হবে।' কিন্তু নতুন এই প্রকল্পে যোগ্যতা কি আগের মতোই রয়েছে? এই নিয়ে জানুন বিস্তারিত।
রাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মহিলাদের কল্যাণে তৈরি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আরও সুসংগঠিতভাবে 'কন্যারত্ন' (West Bengal Kanyaratna Scheme) নামে গোটা রাজ্য জুড়ে পরিচালিত হবে। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, রাজ্যে নারীশিক্ষার প্রসার, স্কুলছুটের হার কমানো এবং মেয়েদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন। মূলত তিনটি ধাপে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রীদের আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রথম ধাপে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ছাত্রীদের বার্ষিক এক হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে, ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে এবং ছাত্রীটি অবিবাহিতা থাকলে তাকে এককালীন ২৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তৃতীয় ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের ছাত্রীদের জন্যও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে এই প্রকল্পে। আর্থিক অনটনের কারণে যাতে কোনও মেয়ের পড়াশোনা মাঝপথে থেমে না যায়, তা সুনিশ্চিত করতেই এই বহুমুখী আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরেও এই উদ্যোগ বিশেষ স্বীকৃতি ও পুরস্কার লাভ করেছে।
কারা পাবে এই প্রকল্পের সুবিধা?
এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের তরফ থেকে বেশ কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেগুলি হল—
কীভাবে আবেদন করবেন?
পূর্বতন সরকারের আমলে কন্যাশ্রী প্রকল্পে সরাসরি স্কুলের মাধ্যমেই আবেদন গ্রহণ করা হতো। সেক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সঙ্গে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংযুক্ত করে বিদ্যালয়ে জমা দিতে হতো। তবে নতুন সরকারের আমলে এখনও পর্যন্ত এই প্রকল্পে আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। আশা করা যাচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি এই প্রকল্প সংক্রান্ত একটি রূপরেখা তুলে ধরা হবে। প্রসঙ্গত, এই প্রকল্পের জন্য বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে বার্থ সার্টিফিকেট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তার পাশাপাশি পরিবারের আয়ের প্রমাণপত্র, আধার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাসবইয়ের জেরক্স, পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি জমা দিতে হয়।
'কন্যারত্ন' প্রকল্পে আবেদন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ এবং তা মূলত অফলাইন মাধ্যমেই বিদ্যালয়ের সাহায্যে করতে হয়। ছাত্রীরা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ স্কুল বা কলেজ থেকেই সরাসরি এই প্রকল্পের আবেদনপত্র বিনামূল্যে সংগ্রহ করতে পারে। বার্ষিক বৃত্তি অর্থাৎ প্রথম ধাপের আবেদনের জন্য হালকা সবুজ রঙের ফর্ম দেওয়া হয় এবং এককালীন অনুদান অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপের জন্য হালকা নীল রঙের ফর্ম ব্যবহার করা হয়। ফর্মটি সংগ্রহ করার পর আবেদনকারীকে নিজের এবং পরিবারের সমস্ত সঠিক তথ্য দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেটি পূরণ করতে হয়। এই প্রকল্পে আবেদনের একটি অন্যতম বড় শর্ত হলো, ছাত্রীর নিজের নামে একটি নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট (থাকতে হবে। কারণ সরকার প্রদত্ত অনুদানের সমস্ত টাকা ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (Direct Benefit Transfer) বা ডিবিটি-র (DBT) মাধ্যমে সরাসরি ছাত্রীর সেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। ফর্মে লেখা নামের বানানের সঙ্গে ব্যাঙ্কের পাসবইয়ে লেখা নামের বানান যেন হুবহু এক থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়। ফর্ম পূরণের পর তা স্কুল বা কলেজের প্রধান শিক্ষকের (কাছে জমা করতে হয়। জমা দেওয়ার পর স্কুল থেকেই ছাত্রীকে একটি প্রাপ্তিস্বীকার রসিদ বা অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ (Acknowledgement Slip) দেওয়া হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ফর্ম নম্বর লেখা থাকে। এই নম্বরের সাহায্যে পরবর্তীতে সরকারি পোর্টালে গিয়ে ছাত্রীরা নিজেদের আবেদনের বর্তমান অবস্থা (Application Status) সহজেই যাচাই করে দেখতে পারে।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আবেদনপত্রের সঙ্গে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংযুক্ত করে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই নথিপত্রগুলির মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্ম শংসাপত্র (Birth Certificate)। অবিবাহিত থাকার প্রমাণস্বরূপ ছাত্রী এবং তার অভিভাবকের স্বাক্ষর করা একটি নিজস্ব ঘোষণাপত্র (Self Declaration) ফর্মে থাকা নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দিতে হয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা প্রমাণের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দেওয়া বার্ষিক আয়ের শংসাপত্র (Income Certificate) প্রদান করতে হয়। এছাড়াও ছাত্রীর নিজের নামে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাসবইয়ের (Bank Passbook) প্রথম পাতার পরিষ্কার জেরক্স কপি, যেখানে অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং আইএফএসসি কোড (IFSC Code) স্পষ্ট বোঝা যায়, তা অবশ্যই জমা করতে হবে। পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে আধার কার্ড (Aadhaar Card) এবং সম্প্রতি তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (Passport Size Photograph) দিতে হয়। বিশেষ ছাড়ের ক্ষেত্রে, প্রতিবন্ধী শংসাপত্র (Disability Certificate) বা পিতা-মাতার মৃত্যুর শংসাপত্র (Death Certificate) জমা দেওয়া আবশ্যিক।