
ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধের জেরে এই মুহূর্তে সঙ্কটে পড়েছে বিশ্ব। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা এই যুদ্ধের জেরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি সেক্টর। কারণ যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হওয়ার অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পেট্রোল, ডিজেল এবং রান্নার গ্যাস নিয়ে সঙ্কটে পড়েছে। যদিও ভারতের অবস্থা এখনও ততটা সঙ্গীন নয়। কিন্তু পরিস্থিতি যাতে বিগড়োতে না পারে, তার জন্য আমজনতাকে একাধিক অনুরোধ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
এই সঙ্কট মোকাবিলায় আগামী এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখার আর্জি জানিয়েছেন PM মোদী। তবে শুধু সোনা নয়, রান্নার তেল, পেট্রোল এবং ডিজেলের ব্যবহারও কম করার পরামর্শ দিয়েছেন নমো।
প্রশ্ন উঠতে পারে সোনা না কেনা বা রান্নার তেল কম ব্যবহার করার সঙ্গে যুদ্ধ ও অর্থনীতির কী সম্পর্ক?
আসলে এটি প্রধানমন্ত্রী মোদীর দীর্ঘমেয়াদী 'সঙ্কট ম্যানেজমেন্ট' পরিকল্পনা। আমরা যখন বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করি, তখন সেই পণ্যের দাম শোধ করতে হয় ডলারে। যুদ্ধের কারণে ডলারের দাম বাড়ছে এবং রুপির দর নামছে। এমন পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদী চাইছেন, অপ্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা কমিয়ে আনা। যাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ার রিজার্ভ সংরক্ষিত থাকে ও দেশের অর্থনৈতিক অবনমন রোধ করা যায়।
সোনা না কেনার হিসেবটা বুঝে নিন
সোনার প্রতি ভারতীয়দের আকর্ষণ কোনও গোপন বিষয় নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকার সোনা আমদানি করে। এই বিপুল পরিমাণে সোনার দাম মেটানোর জন্য প্রচুর ডলারের প্রয়োজন হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী দেশের স্বার্থে এক বছরের জন্য সোনার গয়না কেনা থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণের কাছে আবেদন করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, একটা সময় ছিল যখন দেশ সঙ্কটে পড়লে মানুষ নিজেদের সোনা দান করত। আজ, দানের আর প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধু সারা বছর সোনা কিনে বৈদেশিক মুদ্রার বোঝা না বাড়ানোর সংকল্প করা উচিত।
তবে, সোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর আহ্বানের সরাসরি প্রভাব পড়েছে গয়না শিল্প এবং শেয়ার বাজারের ওপর। সারা দেশের গয়না ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। মানুষ সোনা কেনা বন্ধ করে দিলে পুরো শিল্পটিই ভেঙে পড়বে এবং এই সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। শেয়ার বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ভবিষ্যতে একটি বড় অর্থনৈতিক সঙ্কটের লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সোনা না কেনার বার্তার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথম কারণটি হল, এই অনিশ্চিত যুদ্ধের সময় কম ডলার ব্যয় করলে আমাদের দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে। দ্বিতীয় প্রধান কারণটি হল, সরকার চায় মানুষ নতুন সোনা আমদানি না করে তাদের পুরোনো গহনা পুনর্ব্যবহার করুক। এতে গয়না শিল্প সচল থাকবে এবং বিদেশি দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
এদিকে, তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হল যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেল এবং সারের মূল্যবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দুটি পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, যা সরাসরি আমদানি ব্যয়ের উপর প্রভাব ফেলছে। ভারত জ্বালানি এবং কৃষি চাহিদার জন্য এই জিনিসগুলির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার ফলে এগুলির আমদানি অপরিহার্য। তবে ক্রমবর্ধমান মূল্য ক্রমাগত আমদানি ব্যয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে, বৈদেশিক মুদ্রার উপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপানোর জন্যই সোনা নিয়ে এই রাস্তায় হেঁটেছে মোদী সরকার।