
গত ১৬ অগাস্ট ‘আয়ুষ্মান দিবস’-এর দিন পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (AB-PMJAY)। এই প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দেড় কোটি পরিবার অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রতি বছর ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনাতেও (MMSBY) একই সুবিধা মিলছে। কিন্তু এই দুটি কার্ড যদি না থাকে তাহলে কী হবে? কোনও ব্যক্তির যদি স্বাস্থ্য সাথী থাকে এবং আয়ুষ্মান ভারত ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা না থাকে, তাহলে কি তিনি সুবিধা পাবেন না? এই নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে দিল রাজ্য সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukherjee) জানিয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্যসাথী (Swasthya Sathi Card) কার্ডের পরিষেবাও আপাতত চালু রাখা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন উঠছে, রোগী হাসপাতালে গিয়ে কোন বিমার আওতায় পরিষেবা পাবেন? এই বিভ্রান্তি কাটাতে একটি নির্দেশিকা জারি করেছে স্বাস্থ্য দফতর। সেখানে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে কীভাবে কোন স্বাস্থ্যবিমাতে পরিষেবা পাবেন?
সরকারের নির্দেশিকা ও নতুন নিয়ম
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রোগীর আয়ুষ্মান কার্ড ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেলে তাঁর চিকিৎসা হবে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের অধীনেই। এসওপি অনুযায়ী, নতুন রোগীর রেজিস্ট্রেশনের সময় স্বাস্থ্যসাথী TMS পোর্টাল আইডিতে আধারের তথ্য যাচাই করা হবে। আধার নম্বরটি PM-JAY-এর কার্ড প্রিন্টিং ডেটাবেসে পাওয়া গেলে স্ক্রিনে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, ওই ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা-র সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি আয়ুষ্মান কার্ড ডাউনলোড করার লিঙ্কও থাকবে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ‘Proceed to PMJAY TMS’ অপশন বেছে নিয়ে PM-JAY পোর্টালের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ আয়ুষ্মান কার্ড থাকলে ওই রোগীর চিকিৎসা সরাসরি স্বাস্থ্যসাথী থেকে আয়ুষ্মানে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
PM-JAY পোর্টালে সমস্যা থাকলে কী হবে?
আয়ুষ্মান কার্ড থাকা সত্ত্বেও PM-JAY পোর্টালে কোনও প্রযুক্তিগত বা অন্য সমস্যা দেখা দিলে রোগীর চিকিৎসা যাতে আটকে না যায়, তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে হাসপাতালকে ‘Facing issue in PM-JAY TMS’ অপশনটি বেছে নিতে হবে। এরপর স্বাস্থ্যসাথী ট্রিটমেন্ট কনসেন্ট নামে একটি পপ-আপ খুলবে। সেখানে কী সমস্যা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে সমস্যার প্রমাণ হিসাবে সংশ্লিষ্ট স্ক্রিনশটও আপলোড করতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এই তথ্য জমা দেওয়ার পর প্রসিড টু স্বাস্থ্যসাথী ট্রিটমেন্ট অপশন চালু হবে। তখন স্বাস্থ্যসাথীর স্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতিতে রোগীর চিকিৎসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। অর্থাৎ, PM-JAY পোর্টালে প্রকৃত সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করে স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় চিকিৎসা চালানো যাবে।
পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের জন্য এই নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কোনও রোগী ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (PM-JAY)-এর আওতায় অনুমোদিত হয়ে থাকলে, হাসপাতালকে প্রথমে সেই প্রকল্পের অধীনে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবে আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থায় সত্যিকারের কোনও সমস্যা হলে প্রয়োজনীয় সম্মতি ও প্রমাণ রেখে স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যাবে। রাজ্যের যাচাই এখনও শেষ হয়নি বা কার্ড ছাপা হয়নি—এমন ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যসাথীর চিকিৎসা বন্ধ হবে না। নতুন রোগী নথিভুক্ত করার সময় হাসপাতালের কর্মীকে প্রথমে স্বাস্থ্যসাথীর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা পোর্টালে যেতে হবে। এরপর ‘নতুন নথিভুক্তি’ বিভাগে গিয়ে রোগীর আধার নম্বর দিয়ে খোঁজ করতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই রোগী কোন প্রকল্পের জন্য যোগ্য, তা পরবর্তী ধাপে জানা যাবে। আধার নম্বর খোঁজার পর যদি দেখা যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়ুষ্মান ভারত কার্ড ইতিমধ্যেই ছাপা হয়েছে এবং তিনি পশ্চিমবঙ্গের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের জন্য যোগ্য, তাহলে হাসপাতালকে প্রথমে আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। রোগী নিজেও নির্ধারিত সরকারি পোর্টাল থেকে নিজের কার্ড নামাতে পারবেন। হাসপাতাল যদি আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থায় রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে সরাসরি সেই ব্যবস্থাতেই চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু কোনও প্রকৃত প্রযুক্তিগত বা অন্য সমস্যা হলে ‘আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে’ বিকল্পটি বেছে নিতে হবে। এরপর সেখানে সমস্যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে সমস্যার প্রমাণ হিসেবে ছবি আপলোড করতে হবে। এই দু’টি তথ্য জমা দেওয়ার পরেই স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্পটি সক্রিয় হবে।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড যদি না পান?
কোনও ব্যক্তি জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও যদি তাঁর আয়ুষ্মান ভারত কার্ড এখনও ছাপা না হয়ে থাকে এবং যাচাই প্রক্রিয়া শেষ না হয়, তাহলে স্বাস্থ্যসাথীর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবে হাসপাতাল। অর্থাৎ আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকার কারণে রোগীর চিকিৎসা আটকে থাকবে না। কোনও ব্যক্তি আয়ুষ্মান ভারতের সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হলেও তাঁর পরিচয় যাচাই বা ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ না হয়ে থাকলে, হাসপাতালকে আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করতে হবে। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সের সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে বয়স্কদের জন্য নির্দিষ্ট নিবন্ধন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে। এরপর হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে সরাসরি চিকিৎসার প্রক্রিয়ায় এগোতে পারবে। যদি রোগীর নাম জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার তালিকাতেও না থাকে, তবু তিনি মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যাচাইয়ের ফলের উপর নির্ভর করবে তাঁর যোগ্যতা। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের বয়স্কদের জন্য নির্দিষ্ট নিবন্ধন করতেও বলা হয়েছে। সম্ভাব্য সুবিধাভোগীর ক্ষেত্রে হাসপাতালকে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার ফর্ম দিতে হবে। ফর্মটি পূরণ করিয়ে নেওয়ার পরেই স্বাস্থ্যসাথীর স্বাভাবিক নথিভুক্তি প্রক্রিয়ায় এগোনো যাবে। ভবিষ্যতে সংগ্রহ করা এই ফর্মগুলির তথ্য সরাসরি পোর্টালে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থাও করা হবে।
স্পষ্ট করে দেওয়া বিষয়গুলি
নতুন নির্দেশিকায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নতুন নথিভুক্তির শুরুতেই আধার নম্বর দিয়ে রোগীর তথ্য যাচাই করতে হবে। আয়ুষ্মান ভারত কার্ড ছাপা হয়ে থাকলে সেটিই প্রথম পছন্দ হবে। আয়ুষ্মান ভারত ব্যবস্থায় সত্যিকারের সমস্যা হলেই স্বাস্থ্যসাথীর মাধ্যমে চিকিৎসার সুযোগ নেওয়া যাবে এবং সে ক্ষেত্রে সমস্যার বিবরণ ও পর্দার ছবি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ই-কেওয়াইসি বা ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের নির্দিষ্ট নিবন্ধন বাকি থাকলে আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হবে। আর মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে ফর্ম পূরণ করিয়ে সংগ্রহ করতে হবে। ফলে নতুন ব্যবস্থায় রোগীর আধার নম্বর যাচাই থেকে শুরু করে কার্ডের অবস্থা, পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় ফর্ম এবং হাসপাতালের তরফে প্রমাণ জমা—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। মূল লক্ষ্য হল, যে প্রকল্পের অধীনে রোগী ইতিমধ্যেই অনুমোদিত, সেই প্রকল্পেই প্রথমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং প্রকৃত সমস্যার ক্ষেত্রে যাতে চিকিৎসা কোনওভাবেই বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা।
e-KYC নিয়ে সমস্যা থাকলে
কোনও সুবিধাভোগীর নাম ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি অ্যাক্ট বা NFSA ডেটাবেসে রয়েছে এবং PM-JAY-এর জন্য e-KYC সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু কার্ড এখনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এমন ক্ষেত্রে হাসপাতালকে স্বাস্থ্যসাথীর অধীনেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, NFSA ডেটাবেসে নাম থাকলেও e-KYC সম্পন্ন না হলে আগে PM-JAY পোর্টালে e-KYC করার চেষ্টা করতে হবে। ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সি সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে VVS রেজিস্ট্রেশনও করতে হবে। সেই প্রক্রিয়ার পর স্বাস্থ্যসাথীর অধীনে চিকিৎসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এদিকে, নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান কার্ড না থাকলে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনাতেও মিলবে সুবিধা। হাসপাতাল থেকেই দেওয়া হবে আবেদনপত্র।
আয়ুষ্মান ভারত কার্ড, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার কার্ড, পূর্বতন সরকারের স্বাস্থ্যসাথী কার্ড -এই তিনটি কার্ডের কোনও কার্ডই যদি কোন মানুষের কাছে না থাকে, তখন তিনি কী করবেন ?
স্বাস্থ্যভবন থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রাজ্যে ১হাজার ৩০৩ টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে যেখানেই যাবেন, সেখানে গিয়ে আধার কার্ড দিলে, সেখান থেকে পাওয়া যাবে আয়ুষ্মান ভারত বা মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনায় নাম তোলার ফর্ম। সেখানে গিয়ে সেই ফর্ম ফিলাপ করলে, যা সরকারি নিয়ম আছে, সেই সরকারি নিয়ম মোতাবেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্বের পর কার্ড পেয়ে যাবেন ওই ব্যাক্তি, এমনটাই নিয়ম চালু করা হয়েছে, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যভবনের তরফে।