
Mustard Oil Refined Oil Price Jump 2026: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আঁচ এবার সরাসরি এসে লাগল ভারতের আমজনতার হেঁশেলে। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাশুল গুনতে হচ্ছে এ দেশের মধ্যবিত্তকে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, শুধু পেট্রল-ডিজেলের দামই বাড়ছে না, বরং সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং খাদ্যসামগ্রীও অগ্নিমূল্য হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার তেলের বাজারে, যেখানে দাম বৃদ্ধির সমস্ত রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত মাত্র চার মাসে রিফাইন্ড ভোজ্য তেলের মুদ্রাস্ফীতির হার দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিছিয়ে নেই সরষের তেলও, তার দামেও আকাশছোঁয়া লাফ দেখা গিয়েছে। বর্তমানে বাজারে ক্যাটেগরি এবং প্যাকেট সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভোজ্য তেল ১১০ টাকা থেকে শুরু করে এক ধাক্কায় ২০৭ টাকা প্রতি লিটার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এমনিতেই জ্বালানির চড়া দামে আমজনতার পকেট গড়ের মাঠ, তার ওপর রান্নার তেলের এই অনিয়ন্ত্রিত দাম বৃদ্ধি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে রান্নার তেলের এই আগুন শুধু তেলের বোতলেই সীমাবদ্ধ নেই। এর জেরে সামগ্রিক মুদিখানা বা কিরানা বিলের খরচ একলাফে অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। আসলে প্যাকেটজাত স্ন্যাক্স তৈরিতে ব্যাপক পরিমাণে ভোজ্য তেল ব্যবহার করা হয়। ফলে তেল মহার্ঘ হতেই বেকারি আইটেমের উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনই রেডি টু ইট ফুড বা ঝটপট তৈরি খাবারের দামেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। ফলে নিত্যদিন ব্যবহারের একগুচ্ছ জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।
এই অগ্নিমূল্য পরিস্থিতির মূলে রয়েছে বিশ্বব্যাপী জোগান শৃঙ্খল বা গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের বিপর্যয়। বিশেষ করে ‘হোরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) নিয়ে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনা আন্তর্জাতিক তেল বাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের সমুদ্রপথের তেল বাণিজ্যের সিংহভাগই এই হোরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই স্ট্র্যাটেজিক রুটে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে টান পড়েছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রকেটের গতিতে ছুটছে, যা ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে।
তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের মতো দেশ, যারা বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। ভারতীয় টাকার দাম ডলারের তুলনায় ক্রমাগত পড়তে থাকায় তেল আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। আর তেলের দাম বাড়ার সরাসরি অর্থ হলো পরিবহন খরচ (Transportation Cost) বৃদ্ধি পাওয়া, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বাজারজুড়ে সবজি থেকে চাল-ডাল, সবকিছুরই দাম আকাশছোঁয়া।
এদিকে, রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটের তীব্র সতর্কতা জারি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। এফএও ফুড প্রাইস ইনডেক্স (FAO Food Price Index) টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে গোটা বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থার ওপর তার মারাত্মক কুপ্রভাব পড়বে। যুদ্ধের জেরে শুধু যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ রুদ্ধ হচ্ছে তাই নয়, সার এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের উৎপাদন খরচও একধাক্কায় অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এই জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের প্রভাব কেবল ভারতের হেঁশেলেই সীমাবদ্ধ নেই, সারা বিশ্ব আজ এর কবলে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ার কারণে বিমান ও শিপিং সেক্টর মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছে। ধস নেমেছে একাধিক দেশের মুদ্রার মূল্যে। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলিতে এখন চরম মন্দার কালো মেঘ। বহু আন্তর্জাতিক রিপোর্টে এই বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৭০-এর দশকের সেই ভয়াবহ বিশ্ব জ্বালানি সংকটের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এককথায়, বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা— দুই-ই এখন চরম সংকটের মুখে। আর এই পরিস্থিতি আগামী মাসগুলিতে আমজনতার নিত্যদিনের খাদ্যসামগ্রীকে আরও কতটা মহার্ঘ করে তুলবে, তা ভেবেই সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হচ্ছে।