
একতলা বাড়ি। ছাদে বাহারি রেলিং। দেওয়ালে বাদামি-ধূসর টাইলস। বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড়। পুলিশের গাড়ি। থমথমে পরিবেশ। দামি ফোনের বায়না থেকেই নির্মম পরিণতি নেমে এসেছে এই পরিবারে। এক নিমেষে প্রাণ হারিয়েছেন মা-বাবা, ছেলে। অথচ সেই বাড়িতেই এখনও একাই অপেক্ষা করে চলেছে পরিবারের পোষা কুকুরটি। এই কালো-সাদা কুকুরটির সঙ্গে গতকালও সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিল সে বাড়ির ছেলে কুণাল। কিন্তু কুণাল তো আর ফিরবে না। পরিবারের তিন সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ছত্রপতি সম্ভাজীনগরের সেই বাড়িতে এখন একাই অপেক্ষায় অবলা প্রাণীটি।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর থেকেই কুকুরটির আচরণ বদলে গিয়েছে। ঠিক মতো খাচ্ছে না, জলও পান করছে না। প্রতিবেশীরা তাকে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও সে খাবারে মুখ দিচ্ছে না। কখনও কখনও একটানা ডাকছে। স্থির হয়ে বসতে পারছে না বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়েরা।
সম্ভাজীনগরে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই শোকের ছায়া নেমেছে। সেই ঘটনার পর বাড়িতে থাকা পোষ্য কুকুরটির অবস্থা যেন গোটা পরিস্থিতিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
কুণালের সবচেয়ে কাছের
কুণাল চন্দ্রগুড়ে কুকুরটিকে খুব ভালবাসতেন। প্রতিদিন সকালে দেশি কুকুরটিকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। পোষ্যটির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
কিন্তু কয়েক দিন আগেও যে কিশোর প্রতিদিনের মতো কুকুরটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতেন, তিনি আর ফিরবেন না। মালিকের অপেক্ষায় থাকা কুকুরটি অবশ্য তা বুঝতে পারছে কি না, তা জানা নেই। তবে পরিবারের পরিচিত মানুষগুলির অনুপস্থিতি যেন তার আচরণে স্পষ্ট।
পারিবারিক বিবাদের জেরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে পাহাড়ের দিকে গিয়েছিলেন কুণাল। তাঁকে পাহাড় থেকে নিচে নামতে দেখে বাবা মুরলীধর ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে যান। তিনি কুণালের হাত ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই সময় দু’জনেরই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। প্রায় ৩০০ ফুট নীচে পড়ে যান বাবা ও ছেলে।
চোখের সামনে স্বামী ও ছেলেকে পাহাড় থেকে পড়ে যেতে দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মা সঙ্গীতা চন্দ্রগুড়েও। তিনিও পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেন বলে জানা গিয়েছে। ঘটনায় তিন জনেরই মৃত্যু হয়।
একটি পরিবারের তিন সদস্যের এমন পরিণতিতে শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা।
বাড়িতে এখন শুধু কুকুরটির ডাক
চন্দ্রগুড়ে পরিবার কয়েক মাস আগেই ওই বাড়িতে ভাড়া এসেছিল। এমনটাই জানিয়েছেন বাড়ির মালিক আদিত্য দেশপাণ্ডে। বাবা মুরলীধর পেশায় ট্রাকচালক ছিলেন। কাজের সূত্রে তাঁকে প্রায়ই বাইরে থাকতে হত।
কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে বাবা-মা, ছেলে এবং পোষ্যকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন ছিল, এখন সেখানে শুধুই নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার মধ্যে মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে কুকুরটির ডাক।
প্রতিবেশীদের দাবি, কুকুরটি যেন পরিবারেরই চতূর্থ সদস্য ছিল। তাই হঠাৎ করে সবাইকে হারিয়ে সে যেন সত্যিই ভেঙে পড়েছে। খেতে চাইছে না।
এখন প্রতিবেশীদের একটাই চিন্তা; বাড়িতে একা বন্দি থাকা কুকুরটির কী হবে? স্থানীয়েরা পুলিশের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, দ্রুত কুকুরটিকে বাড়ি থেকে বের করে তার দেখভালের ব্যবস্থা করা হোক।