
ঘরে ফ্যান ছাড়া গরমকালে শোয়ার কথা ভাবলেই অস্বস্তি হতে শুরু করে। ভারতে বেশিরভাগ মানুষ ফ্যান ছাড়া ঘুমনোর কথা ভাবতেই পারে না। তবে এমন একটি দেশ আছে যেখানে মানুষ বহুকাল ধরেই রাতে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোতে ভয় পায়। সেটি হল দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বাস অনুসারে, একটি বন্ধ ঘরে সারারাত ফ্যান চালিয়ে ঘুমোলে মৃত্যুও হতে পারে। শুনতে অদ্ভূত লাগলেও কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক বাড়িতে এই ভয় এতটাই প্রবল, মানুষ ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফ্যান বন্ধ করে দিত। আচমকা সেই ট্রেন্ড আবার ভাইরাল।
কীভাবে ফ্যান মৃত্যুর কারণ হতে পারে?
মানুষ কেন বিশ্বাস করত, একটি ফ্যান মৃত্যুর কারণ হতে পারে? এই বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। একটি বিশ্বাস ছিল, যদি কোনও ব্যক্তি একটি বদ্ধ ঘরে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোয় তবে ফ্যানটি ঘরের তাপমাত্রা এতটাই কমিয়ে দিতে পারে, হাইপোথার্মিয়া হতে পারে। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করতেন, একটি বদ্ধ ঘরে একটানা ফ্যান চললে শ্বাসকষ্ট হতে পারে এবং দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে। তবে এই দাবিগুলি বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত নয়। সুতরাং শুধুমাত্র ফ্যান চালিয়ে ঘুমোলে একজন সুস্থ ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে, এই বিশ্বাসের কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পাখায় টাইমার লাগানো হত
এই বিশ্বাসের গভীরতা থেকেই অনুমান করা যায়, সেখানে বিক্রি হওয়া অনেক পাখাতেই টাইমার লাগানো থাকত। লোকেরা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পাখার টাইমার সেট করে দিত যাতে এটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয় ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর অর্থ হল, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ যাকে গরম থেকে স্বস্তি পাওয়ার উপায় মনে করে, তা দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রাচীণ বিশ্বাসে ভয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিত এবং প্রযুক্তিগত ভাবে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এমন একটি বিশ্বাস কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বলা হয়ে থাকে, এই বিশ্বাসের শিকড় কয়েক দশক আগের।
দক্ষিণ কোরিয়ায় 'ফ্যান ডেথ' বা 'পাখার কারণে মৃত্যু'-র প্রথম খবর আসে ৭-এর দশকে। সে সময়ে দেশটি জ্বালানি সঙ্কট এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ মূল্যের বৃদ্ধির মতো সমস্যা নিয়ে জর্জরিত ছিল। ধীরে ধীরে এই খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, রাতে ফ্যান তালিয়ে ঘুমমো প্রাণঘাতী হতে পারে।
এমনকী কিছু লোক বিশ্বস করতে শুরু করেছিল, ফ্যান ঘরের বাতাস পরিবর্তন করে। যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হয়। কিছু তত্ত্বে এমনও বলা হয়েছিল, ক্রমাগত ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক ভাবে কমে যেতে পারে। এরই মধ্যে ফ্যানের কারণে মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসতে শুরু করে। মনে করা হয়, এই খবরগুলি এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকারের প্রচেষ্টা এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সরকার কি ইচ্ছাকৃত ভাবে জনগণের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছিল?
সরকার 'ফ্যান ডেথ' গল্পটি মনগড়া ভাবে তৈরি করেছিল। এই দাবিটি সরাসরি প্রমাণিত নয়। তবে ধারণা করা যায়, ৭-এর দশকে জ্বালানি সঙ্কটের সময়ে সরকারি প্রচার এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এই ভীতি ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। সেই সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা একটি জরুরি প্রয়োজন ছিল। তাই এই সম্পর্কিত ভয় এবং সংবাদ সারারাত ফ্যান চালানোর অভ্যাস কমানোর জন্য মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
এই কারণেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাখার আঘাতে মৃত্যুর ধারণাটি জনগণের মধ্যে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় আধুনিক লোকবিশ্বাসে পরিণত হয়।
যুবসমাজ প্রশ্ন তুলছে
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বদলে গিয়েছে। উন্নত বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং ইন্টারনেটের এই যুগে তরুণ প্রজন্ম এই ধরনের ভয়কে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে একটি ফ্যান স্বয়ংক্রিয় ভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলে না। এর অর্থ হল, যে বিষয়টিকে অনেক পরিবার একসময়ে গুরুত্বের সঙ্গে নিত নতুন প্রজন্ম এখন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।