
সিনেমার গল্পের সাক্ষী থাকল মালদার চাঁচলের ইসলামপুর গ্রামের ছকর ডিগি এলাকা। ১৫ বছর আগে হারানো ছেলেকে ফিরে পেল মালদার পরিবার। এক যুগেরও বেশি সময় পর ছেলেকে দেখতে পেয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না মা। কার্যত বিষ্ময়ে পাথর বাবা!
চাঁচলের ছোট্ট গ্রাম ইসলামপুরে এখন উৎসবের আবহ। কিন্তু এই আনন্দের পিছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ ১৫ বছরের কষ্টের ইতিহাস। মারুফ আলির ছেলে নাজিমুল হক প্রায় পনেরো বছর আগে আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রথমে পরিবারের লোক আশেপাশে খোঁজার চেষ্টা করেও সফল হয়নি, তারপর পুলিশ-প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও লাভ হয়নি। অবশেষে ১৫ বছর পর ভাগ্যবদল।
গ্রামের প্রতিবেশীরা বলছেন, নাজিমুলের মা নাকি আজও সন্ধ্যা নামলে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। রাস্তা দিয়ে কেউ হাঁটলে মনে করতেন, এই বুঝি ছেলে ফিরল।ইদের দিন নতুন জামা দেখলে কেঁদে ফেলতেন। অন্যের ছেলেকে বাড়ি ফিরতে দেখলে বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠত। কারণ মা কখনও অপেক্ষা ছাড়তে পারেন না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য জীবন থেমে থাকেনি। বাড়ির মানুষ কাজ করেছেন, সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু একটা শূন্যতা সবসময় থেকে গিয়েছে। নাজিমুলের কথা উঠলেই বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে যেত। তারপর হঠাৎ একদিন বদলে যায় সবকিছু।
বছর খানেক আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও চোখে পড়ে পরিবারের এক সদস্যের। ভিডিওতে দেখা যায় এক যুবককে। মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। তারপর বারবার ভিডিও দেখে সবাই থমকে যায়। এ কি নাজিমুল? চোখ, মুখ, কথা বলার ভঙ্গি — সবকিছু যেন হারিয়ে যাওয়া ছেলের মতোই। ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়ে পড়ে পরিবারের মধ্যে। তারপর শুরু হয় নতুন লড়াই। এইবার আর খোঁজ নয়, ছেলেকে ঘরে ফেরানোর যুদ্ধ। জানা যায়, নাজিমুল বাংলাদেশে রয়েছে। কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল, কী পরিস্থিতিতে এত বছর কাটিয়েছে — সবটা এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় — সে বেঁচে আছে। এই খবর পাওয়ার পর থেকেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় পরিবার। তারপর প্রশাসনের দ্বারস্থ হন তাঁরা। খবর সামনে আসে সংবাদমাধ্যমে। বিষয়টি পৌঁছে যায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিদেশ মন্ত্রক পর্যন্ত। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, কাগজপত্র, যোগাযোগ, যাচাই-বাছাই।
পরবর্তী এক বছরও ছিল ভীষণ কঠিন। কারণ সামনে আশা থাকলেও নিশ্চিত কিছু ছিল না। প্রতিদিন একটা অপেক্ষা — “আজ কি খবর আসবে?” অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এল। মালদার মহদিপুর সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরলেন নাজিমুল হক। সীমান্ত পেরিয়ে নিজের মাটিতে পা রাখার মুহূর্তটা কেমন ছিল, সেটা ভাষায় বোঝানো কঠিন। যাঁরা সেখানে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই বলছেন, দৃশ্যটা দেখে চোখের জল আটকে রাখা যায়নি। আর যখন নাজিমুল বাড়িতে পৌঁছলেন, তখন যেন গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল আবেগে। মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুধু কেঁদেই গিয়েছেন। ১৫ বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল।
নাজিমুল এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। গ্রামের মানুষ তাঁকে দেখতে আসছেন। কেউ মিষ্টি নিয়ে আসছেন, কেউ গল্প করছেন। যেন একটা মানুষ নয়, গোটা পরিবার নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। ঘটনার পর পরিবার ভারত সরকার ও প্রশাসনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। কারণ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া আর সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই প্রত্যাবর্তন সম্ভব হত না।
মিলটন পাল