
Post Poll Violence Coochbehar: রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বদলে যেতেই যেন ওলটপালট হয়ে গিয়েছে চেনা সমীকরণ। মসনদ হাতছাড়া হতেই এতদিন ধরে বুক ফুলিয়ে চলা ঘাসফুল শিবিরের দাপুটে নেতাদের ঘিরে এখন জনরোষ। কোথাও তোলাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে নেতাদের ঘেরাও করে চলছে জেরা, আবার কোথাও সশরীরে হাজির হয়ে মানুষ সটান দাবি তুলছেন ‘কাটমানি’ ফেরতের। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ক্ষমতার ছাতাটি মাথা থেকে সরতেই এতদিন ধরে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভের বাঁধ ভেঙেছে, যার জেরে কোচবিহারের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন কার্যত কোণঠাসা বিদায়ী শাসকদলের নেতারা।
রবিবার সকালে তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের মহিষকুচি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের টাকোয়ামারি এলাকায় এক চরম অশান্তির পরিবেশ তৈরি হয়। অভিযোগ, বিজেপির ‘বাইক বাহিনী’ দলবদ্ধভাবে চড়াও হয় স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের বাড়ি লক্ষ্য করে। লাঠিসোটা নিয়ে একদল দুষ্কৃতী যুব তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি আমিনুর মিয়ার বাড়িতে তাণ্ডব চালায়। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চারচাকা গাড়ি ও জানালার কাচ ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় ঘরের ভেতর ঘুমোচ্ছিল আমিনুরের সদ্যোজাত কন্যাসন্তান, জানালার কাচ ভেঙে সোজা এসে পড়ে তার বিছানায়। আতঙ্কিত আকসানা পারভীনের প্রশ্ন, স্বামী তৃণমূল করে বলেই কি দিন-রাত এই বোমাবাজি আর ভাঙচুরের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে বাঁচতে হবে?
একই গ্রামে আরেক তৃণমূল কর্মীর বাড়িতেও আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ঘরের ভেতর ঢুকে ফ্রিজ, ওভেন থেকে শুরু করে রান্নার হাঁড়ি পর্যন্ত ভাঙচুর করা হয়, উঠোনে থাকা গাড়ি ও মোটরবাইকও রেহাই পায়নি। আক্রান্ত কর্মীর স্ত্রী তথা সিভিক ভলান্টিয়ার সাইমা খাতুনের অভিযোগ, বাধা দিতে গেলে বাড়ির মহিলাদের গায়ে হাত তোলা হয়, এমনকী তাঁদের ছোট মেয়েটিকেও চড় মারে দুষ্কৃতীরা। মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলায় এবং লাগাতার হুমকির জেরে প্রাণভয়ে এলাকাছাড়া বহু তৃণমূল কর্মী এখন ঘরে ফিরতে রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত।
জেলার অন্য প্রান্তে মাথা চাড়া দিয়েছে ‘কাটমানি’ আদায়ের গণবিক্ষোভ। দেওয়ানহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কাকলি বর্মন রায়ের বাড়ির সামনে রবিবার সকাল থেকেই অবস্থান বিক্ষোভে বসেন শয়ে শয়ে ভুক্তভোগী গ্রামবাসী। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, বাংলার আবাস যোজনার সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে প্রধানের নেতৃত্বে তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা কারও কাছ থেকে ১০ হাজার, কারও কাছ থেকে ২০ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কাটমানি নিয়েছেন। রাজ্যে ক্ষমতার বদল হতেই এবার সেই আত্মসাৎ করা টাকা সশরীরে আদায়ের দাবিতে কোমর বেঁধে নেমেছেন বাসিন্দারা। যদিও অভিযুক্ত প্রধানের দাবি, তিনি নিজে কোনও টাকা নেননি, তবে তাঁর অবর্তমানে তাঁর নাম ভাঙিয়ে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তাদের ডেকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
রাজ্যে তৃণমূল জমানার অবসান ঘটতেই একের পর এক জনপ্রতিনিধির বাড়ির সামনে এই চেনা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। গত শনিবারই দিনহাটার পুঁটিমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের জড়াবাড়ি এলাকায় উপপ্রধান প্রিয়ঙ্কর রায় বর্মনের বাড়ির সামনে ফেটে পড়েছিল ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভ। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই দেওয়ানহাটের বাসিন্দা বিশ্বনাথ বর্মনের মতো মানুষরা প্রধানের বাড়ির সামনে সোচ্চার হয়েছেন। বিশ্বনাথবাবুর বিস্ফোরক অভিযোগ, ঘরের টাকা পাওয়ার আগেই তাঁর কাছ থেকে প্রথমে ১০ হাজার এবং পরে আরও ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। কায়ক্লেশে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েও শেষ পর্যন্ত সরকারি ঘরটি তিনি ঠিকমতো তুলতেই পারেননি।
অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে গেরুয়া শিবির। বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি উজ্জ্বল কান্তি বসাকের পাল্টা দাবি, তুফানগঞ্জ-২ ব্লকে তৃণমূলের ভেতরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের পুরোনো রোগ। এখন নিজেদের দলের পতাকা ব্যবহার করে নিজেরা নিজেদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করছে, যাতে রাজনৈতিকভাবে বিজেপিকে কালিমালিপ্ত করা যায়। এই হামলার সঙ্গে বিজেপির কোনও স্তরের কর্মী যুক্ত নয় বলেই তাঁর দাবি। আপাতত নতুন করে অশান্তি রুখতে বক্সিরহাট থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে, চলছে কড়া টহলদারি। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলেই আইন অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।