
উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় এক বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য বন দপ্তর। মহানন্দা অভয়ারণ্যের চারপাশের এক কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল বা ইকো সেনসিটিভ জ়োন হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারিতে বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁয়ের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ে। মন্ত্রী হওয়ার পর এদিনই প্রথম বেঙ্গল সাফারি পরিদর্শনে আসেন বনমন্ত্রী। সেখানে একটি বিশেষ বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি জানান যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণীদেরও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং এই বনাঞ্চলের পরিধি আরও বাড়ানোর পাশাপাশি বেঙ্গল সাফারির সার্বিক উন্নয়নের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে গাছ লাগানোর জন্য আন্তরিক আহ্বান জানান।
এদিনের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বনমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, অর্থ ও পরিবহণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন এবং ডাবগ্রাম ফুলবাড়ির বিধায়িকা শিখা চট্টোপাধ্যায়। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, চা বাগান মালিক সংগঠন এবং একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই আলোচনায় অংশ নেন। উল্লেখ্য যে সংরক্ষিত অভয়ারণ্যের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কোনও ধরনের বহুতল ভবন বা কলকারখানা নির্মাণ করা যাবে না বলে পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলেই একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বুধবারের বৈঠকে সেই পুরনো সিদ্ধান্তকেই নতুন করে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করানো হল। ফেডারেশন অব চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ নর্থ বেঙ্গলের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ দাস এই প্রসঙ্গে জানান যে এদিনের বৈঠকে বন দপ্তরের প্রস্তাবকে সকলেই সাধুবাদ ও সমর্থন জানিয়েছেন এবং এর ফলে দীর্ঘদিনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত মিটে যাবে বলে তারা আশা করছেন।
অবশ্য এই ইকো সেনসিটিভ জ়োন ঘোষণার প্রক্রিয়াটি এর আগে কিছু প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়েছিল। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আধিকারিকেরা নিয়ম মেনে এক কিলোমিটার এলাকাকে সংবেদনশীল জোন করার প্রস্তাব দিলেও দার্জিলিংয়ের তৎকালীন আধিকারিক আচমকাই পাঁচ কিলোমিটার এলাকাকে ইকো সেনসিটিভ জোন ঘোষণার প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন। ওই বর্ধিত প্রস্তাব ঘিরেই মূল গোলমালের সূত্রপাত হয়। তাছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এক কিলোমিটারের মধ্যে নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণের এই প্রস্তাব নিয়ে চা বাগান মালিকদের একাংশ এবং কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আগে আপত্তি তোলায় নতুন করে আবার বৈঠক ডাকতে হয়। এই সমস্ত কারণে এতদিন কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের চূড়ান্ত ছাড়পত্র মেলেনি। তবে এদিনের সফল বৈঠকের পর দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নতুন সিদ্ধান্তটি দ্রুত রাজ্য পরিবেশ দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে এবং সেখান থেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হবে। ব্যবসায়ী মহল আশাবাদী যে এবার খুব দ্রুতই দিল্লির সবুজ সংকেত মিলবে।
বনাঞ্চলের এই খবরের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আপডেট মিলেছে এই বৈঠক থেকে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা কাটাতে এবং সদ্য রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের পর তৈরি হওয়া সংকট দূর করতে খোদ মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য বা ভিসি নিয়োগ করা হবে। এর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে উত্তরবঙ্গের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা জিএসটি অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলা হবে বলেও রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর তরফ থেকে নিশ্চিত আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।