
বীরভূমের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে অনুব্রত মণ্ডল। একদিকে সিউড়িতে গণতান্ত্রিক তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে নিজের দলেরই একাংশের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। অভিযোগ, তাঁর উপস্থিতিতেই কার্যালয়ের ভিতরে ভাঙচুর চালান কয়েকজন যুবক। আর সেই ঘটনার পরেই রাজ্য সরকারের তরফে অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয়েছে একজন সশস্ত্র দেহরক্ষী। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। প্রশ্ন উঠছে, যে অনুব্রত মণ্ডলকে একাধিক মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেল খাটতে হয়েছে, তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব এবার নিচ্ছে সেই রাজ্য সরকারই। কেন হঠাৎ তাঁর নিরাপত্তার প্রয়োজন পড়ল? সিউড়ির দলীয় কার্যালয়ে বিক্ষোভের ঘটনার সঙ্গে কি এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সরাসরি যোগ রয়েছে? নাকি প্রশাসনের কাছে এমন কোনও তথ্য এসেছে, যার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বীরভূমের তৃণমূল রাজনীতিতে কি অনুব্রত মণ্ডলের পুরনো কর্তৃত্বে কোথাও ধাক্কা লাগছে?
এই ঘটনায় বিজেপির প্রতিক্রিয়াও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ বলেছেন, প্রশাসন যদি মনে করে কারও জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে তাঁকে নিরাপত্তারক্ষী দিতেই পারে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু যারা অপরাধী, তারা ছাড় পাবে না। সেই কারণেই অনুব্রত মণ্ডলকে জেল খাটতে হয়েছে।
অর্থাৎ, নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সরাসরি বিরোধিতা না করেও বিজেপি সাংসদ অনুব্রতর অতীতের মামলাগুলিকে সামনে এনে রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে। নিরাপত্তা পাওয়া মানেই অতীতের অভিযোগ মুছে যাওয়া নয়। অন্যদিকে, প্রশাসনের কাছে যদি কারও প্রাণহানির আশঙ্কা সংক্রান্ত তথ্য থাকে, তাহলে নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ফলে এই বিতর্কে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু গোটা ঘটনার সূত্রপাত কোথায়? ফিরে যেতে হবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। সেদিন সিউড়িতে গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে গিয়েছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। বীরভূমের রাজনীতিতে একসময় তাঁর প্রভাব কতটা ছিল, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জেলার সংগঠন থেকে শুরু করে নির্বাচনী কৌশল, দলীয় কর্মসূচি—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হত। তাঁর একটি মন্তব্য বা রাজনৈতিক পদক্ষেপকে ঘিরে গোটা রাজ্যে আলোচনা শুরু হয়ে যেত। সেই অনুব্রত মণ্ডলকেই এবার নিজের দলের কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হল। অভিযোগ, তাঁর সামনেই কয়েকজন যুবক দলীয় কার্যালয়ের ভিতরে ভাঙচুর চালান। ঘটনাটি শুধু একটি দলীয় অফিসে বিক্ষোভ বা ভাঙচুরের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, দলেরই কার্যালয়ে অনুব্রত মণ্ডলের উপস্থিতিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল কীভাবে?
রাজনীতিতে বিরোধী দলের কর্মীরা বিক্ষোভ দেখালে তার একটা পরিচিত ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু নিজের দলের কার্যালয়ে নিজেরই নেতাকে ঘিরে বিক্ষোভ হলে সেই ঘটনার তাৎপর্য আলাদা। বিশেষ করে সেই নেতা যদি হন অনুব্রত মণ্ডলের মতো একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, দলের ভিতরে কি তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে? বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ বা দাবির পিছনে কি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কারণ রয়েছে? নাকি স্থানীয় স্তরে কোনও বিরোধ থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তাই সিউড়ির ঘটনাকে সরাসরি অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাটি যে গণতান্ত্রিক তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি তৈরি করেছে, তা বলাই যায়। কারণ, অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবনে গত কয়েক বছরে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় বীরভূমের তৃণমূল সংগঠনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। কিন্তু একাধিক মামলায় তাঁর নাম জড়ানো, গ্রেফতারি এবং দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকার কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি ব্যাহত হয়। সেই সময়ে জেলার সংগঠনও থেমে থাকেনি। দলের অন্যান্য নেতারা নিজেদের মতো করে সংগঠনের কাজ সামলেছেন। বিভিন্ন এলাকায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব বেড়েছে। কর্মীদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময়ের বিরতির পর অনুব্রত মণ্ডল আবার সক্রিয় হলে পুরনো সংগঠন ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
এই জায়গাতেই সিউড়ির ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনুব্রত মণ্ডল কি এখনও আগের মতোই বীরভূমের তৃণমূল সংগঠনের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন? দলের কর্মীরা কি আগের মতোই তাঁর নির্দেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন? নাকি দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির কারণে সংগঠনের ভিতরে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়েছে? অবশ্যই, একটি বিক্ষোভের ঘটনা দিয়ে এই প্রশ্নগুলির চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এবং বীরভূমে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। ফলে সিউড়ির বিক্ষোভকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। এর মধ্যেই তাঁর নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র দেহরক্ষী দেওয়ার খবর সামনে আসে। এই সিদ্ধান্তের সময়টাই বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভের পরেই অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। রাজ্য সরকারের তরফে একজন সশস্ত্র দেহরক্ষী দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে কেন এই নিরাপত্তা, কোন পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত, কিংবা প্রশাসনের কাছে কোনও নির্দিষ্ট হুমকির তথ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে রাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে আসেনি। তাই সিউড়ির ঘটনার কারণেই তাঁকে দেহরক্ষী দেওয়া হয়েছে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে দুটি ঘটনা পরপর ঘটায় রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন কী কী বিষয় বিবেচনা করে? সাধারণত কোনও ব্যক্তির উপর হামলার আশঙ্কা, তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনসমক্ষে উপস্থিতির পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি খতিয়ে দেখেই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুব্রত মণ্ডলের ক্ষেত্রেও কি তেমন কোনও মূল্যায়ন হয়েছে? সিউড়ির ঘটনার পর তাঁর উপর হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল? নাকি অন্য কোনও সূত্র থেকে প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তাজনিত সতর্কবার্তা এসেছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর জানা গেলে সিদ্ধান্তটির প্রকৃত কারণ বোঝা সহজ হবে। কিন্তু সরকারি ব্যাখ্যা না থাকায় আপাতত বিষয়টি নিয়ে জল্পনা চলছেই। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। কারও বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বা তিনি অতীতে জেল খেটেছেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁর নিরাপত্তার অধিকার থাকবে না। আবার নিরাপত্তারক্ষী পাওয়ার অর্থও এই নয় যে তিনি কোনও মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে গিয়েছেন। দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। আদালতে অভিযোগের বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়, আর নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করবে প্রশাসন। বিজেপি সাংসদের বক্তব্যেও এই দুই বিষয়কে আলাদা রাখার চেষ্টা দেখা গিয়েছে। তিনি একদিকে অনুব্রত মণ্ডলের জেল খাটার প্রসঙ্গ তুলেছেন, অন্যদিকে প্রশাসনের নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সরাসরি ভুল বলেননি। রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্যের সুবিধা হল, বিজেপি একদিকে নিজের আক্রমণ বজায় রাখতে পারছে, অন্যদিকে নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়েও সরাসরি বিরোধিতার অবস্থানে যেতে হচ্ছে না।
তবে বিজেপির কাছে অনুব্রত মণ্ডলকে ঘিরে এই বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বীরভূমের রাজনীতিতে অনুব্রত মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির অন্যতম প্রধান আক্রমণের লক্ষ্য। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারি এবং জেলবন্দি থাকার বিষয়গুলি বিজেপি বারবার রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করেছে। এবার তাঁর নিরাপত্তার জন্য রাজ্য সরকারের তরফে সশস্ত্র দেহরক্ষী দেওয়ার খবর সামনে আসায় সেই পুরনো প্রসঙ্গ ফের সামনে আনার সুযোগ পেয়েছে বিরোধীরা। বিজেপির বক্তব্যের মূল লক্ষ্য সম্ভবত এটাই—রাজ্য সরকার একজন বিতর্কিত নেতাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, অথচ তাঁর অতীতের মামলাগুলির বিষয়টি ভুলে যাওয়া যায় না।
এদিকে মহালয়ার আগের দিন শুক্রবার সিউড়ির দলীয় কার্যালয়ে অনুব্রত মণ্ডলের যাওয়ার কথা ছিল বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু পুরনো একটি মামলার কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সেদিন তাঁর সেখানে উপস্থিত থাকার কথা নয় বলে জানা যায়। ফলে ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর তিনি আবার ওই কার্যালয়ে গেলে পরিস্থিতি কী হয়, তা দেখার সুযোগ আপাতত তৈরি হয়নি। তিনি সেখানে গেলে দলের কর্মীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতেন, আগের বিক্ষোভ নিয়ে কোনও আলোচনা হত কি না, কিংবা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর কোনও বৈঠক হত কি না—এসব বিষয় নিয়ে আগ্রহ ছিল রাজনৈতিক মহলের। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে সেদিন সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক অবস্থান এখন নতুন করে আলোচনার মুখে। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির পর তিনি সংগঠনে কতটা সক্রিয় হতে পারবেন, জেলার অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় কেমন হবে এবং কর্মীদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা রয়েছে, তা আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহেই বোঝা যাবে। কারণ, রাজনীতিতে পুরনো প্রভাব ফিরে পাওয়া সব সময় সহজ নয়। একজন নেতা একসময় যতই শক্তিশালী হোন না কেন, দীর্ঘ বিরতির পর তাঁকে আবার সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। কর্মীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। বীরভূমেও সেই পরীক্ষার মুখে পড়তে পারেন অনুব্রত মণ্ডল।