
একসময় যার নাম শুনলেই কেঁপে উঠত জেলার মানুষ, সেই মুখই এবার দেখা গেল গেরুয়া মঞ্চে। একসময় দাপট ছিল অপরাধের দুনিয়ায়, আর আজ সেই রমেশ মাহাতোই BJP-র সভার মঞ্চে উঠে নিলেন সংবর্ধনা। মুহূর্তেই বদলে গেল ছবিটা। সামনে এল রাজনীতির মঞ্চ, আর তার পিছনে উঁকি দিতে শুরু করল অতীতের সেই অন্ধকার অধ্যায়। আর সেই অতীত নিয়েই এবার অস্বস্তি BJP-র অন্দরে। দলেরই বিধায়ক সরব, দলেরই এক কার্যকর্তার পাল্টা সাফাই। একজনের চোখে রমেশ মাহাতো ‘কালো সাম্রাজ্য’-এর মুখ, অন্যজনের কাছে তিনি ‘রমেশ বাবু’, যিনি অতীত ভুলে সমাজসেবার পথে হাঁটতে পারেন। ফলে একজন রমেশকে ঘিরেই এখন প্রকাশ্যে BJP-র ভিতরের দুই ভিন্ন সুর। সামনে আসছে BJP-র অন্দরের টানাপোড়েনের ছবিও। তাহলে কি পুরনো ‘কালো সাম্রাজ্য’-এর ছায়া এবার ঢুকে পড়ছে গেরুয়া রাজনীতির মঞ্চে? নাকি অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন করে সমাজসেবার পথে হাঁটতে চাইছেন রমেশ? এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে।
ঘটনার সূত্রপাত হুগলির জাঙ্গিপাড়ার দীলাকাশ গ্রাম পঞ্চায়েতের খুড়িগাছি গ্রামে। গত ১০ সেপ্টেম্বর BJP-র একটি কর্মসূচিতে মঞ্চে উঠে সংবর্ধনা নিতে দেখা যায় রমেশ মাহাতোকে। একসময় হাওড়া-হুগলি দুই জেলার ত্রাস বলে পরিচিত হুব্বা শ্যামলের ছায়াসঙ্গী হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছে। ২০১১ সালে হুব্বা শ্যামল খুনের ঘটনায় রমেশ গ্রেফতারও হয়েছিল। এরপর হুব্বার অনুপস্থিতিতে তাঁর দাপট আরও বেড়েছিল বলে অভিযোগ। জেলবন্দি অবস্থাতেও ফোনের মাধ্যমে তোলাবাজি-সহ একাধিক অপরাধমূলক কাজ চালানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে জামিনে মুক্ত রমেশ।কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে সরকার। গুন্ডা দমন আইন থেকে শুরু করে অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছে সরকার। এমন একটা সময়ে রমেশ মাহাতোর মতো বিতর্কিত অতীতের একজনকে BJP-র কর্মসূচির মঞ্চে দেখা যেতেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অস্বস্তি। আর সেই অস্বস্তি প্রকাশ্যে আনতে দেরি করেননি জাঙ্গিপাড়ার BJP বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ।
প্রসেনজিৎ বাগের অভিযোগ, রমেশের বিরুদ্ধে ৩০টিরও বেশি খুনের অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি হুব্বা শ্যামলের ডান হাত ছিলেন। তাঁর দাবি, এখন ভাল ভাল কথা বলে এলাকার সহজ-সরল মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। এমনকী এলাকায় নেশার ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেন তিনি। বিধায়কের বক্তব্য, নেশামুক্ত সমাজ গড়ার জন্য যখন লড়াই চলছে, তখন এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে সামনে এনে BJP-র নাম ব্যবহার করা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
শুধু সেখানেই থামেননি বিধায়ক। যাঁরা নিজেদের BJP-র কর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছেন, তাঁদের দলের সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অন্য রাজনৈতিক দলের পুরনো পরিচয় ঢাকার চেষ্টা করেন, তাহলে BJP তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। দলের কাছে ইতিমধ্যেই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন প্রসেনজিৎ।তবে রমেশ মাহাতো জানান- সততার সঙ্গে কাজ করতে চাই। আমরা মানুষের সঙ্গে আছি।
তবে এখানেই গল্পে আসে নতুন মোড়। বিধায়কের অভিযোগের ঠিক উল্টো সুর শোনা যায় সেদিনের অনুষ্ঠানের কার্যকর্তা দেবেশ কোলের গলায়। তাঁর যুক্তি, দস্যু রত্নাকরও একদিন বাল্মীকি হয়েছিলেন। অতীত ভুলে কেউ যদি সমাজসেবার কাজে এগিয়ে আসতে চান, তাহলে তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া উচিত। দেবেশের দাবি, তিনি ‘রমেশ মাহাতো’কে চেনেন না, তিনি ‘রমেশ বাবু’কে চেনেন।
আর এখানেই প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, একই দলের মঞ্চ, একই অনুষ্ঠান, অথচ রমেশকে ঘিরে দুই বিপরীত বক্তব্য! একজন বলছেন, এতে নতুন করে ‘কালো সাম্রাজ্য’-এর আশঙ্কা। অন্যজন বলছেন, অতীত ভুলে নতুন পথে হাঁটার সুযোগ দেওয়া উচিত।তাহলে রমেশ মাহাতোকে ঘিরে এই বিতর্ক কি শুধুই একজন ব্যক্তিকে নিয়ে? নাকি এর আড়ালে BJP-র অন্দরের বড় কোনও রাজনৈতিক টানাপোড়েন সামনে চলে এল? রমেশকে সামনে রেখে এখন সেই প্রশ্নই আরও জোরালো, দল কি অতীতের হিসেব দেখবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেবে?
রিপোর্টার: পার্থ রাহা