
বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যেই দানা বেঁধেছে নিম্নচাপ। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তা আরও শক্তি বাড়িয়ে সেটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। আর তারপর পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে আরও এক ধাপ শক্তিশালী হয়ে পরিণত হতে পারে ঘূর্ণিঝড়ে। যদিও এই মুহূর্তে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হবে বলে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেয়নি মৌসম ভবন, তবু সাগরের উপর সিস্টেমটির ক্রমশ শক্তি বাড়ানোয় নজর রাখছেন আবহবিদরা।
২১ সেপ্টেম্বর পশ্চিম-মধ্য ও সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের উপর অবস্থান করছিল সিস্টেমটি। এর অবস্থান ছিল প্রায় ১৭.৭ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭.৮ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের কাছে। সেই সময় এটি ওড়িশার পুরী থেকে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং গোপালপুর থেকে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে ছিল। অন্ধ্রপ্রদেশের কলিঙ্গপত্তনম থেকে দূরত্ব ছিল প্রায় ৩৯০ কিলোমিটার এবং বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার।
এখন সিস্টেমটির গতিপথ পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমমুখী। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, আগামী ২৪ ঘণ্টায় এটি আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। এরপরও একই দিকে এগিয়ে গিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর রাত থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরের মধ্যে উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের মাঝামাঝি এলাকায় স্থলভাগে ঢোকার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্য প্রবেশপথটি বিশাখাপত্তনম ও গোপালপুরের মধ্যবর্তী উপকূল।
আবহাওয়ার কোনও সিস্টেমকে ঘূর্ণিঝড় বলতে গেলে তার শক্তি গভীর নিম্নচাপের চেয়ে আরও বাড়তে হয়। অর্থাৎ সিস্টেমটি যদি গভীর নিম্নচাপের পর আরও শক্তি সঞ্চয় করে, তখন সেটি ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে যেতে পারে।
কেন এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে? কারণ সিস্টেমটি এখনও সমুদ্রের উপর রয়েছে এবং পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে। সমুদ্রের উপর থাকা অবস্থায় কোনও নিম্নচাপ পর্যাপ্ত উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠ, অনুকূল বায়ুপ্রবাহ এবং অন্যান্য পরিবেশগত পরিস্থিতি পেলে আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে সব নিম্নচাপই ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় না। এই সিস্টেমের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত কতটা শক্তি বাড়বে, তা পরবর্তী কয়েকটি পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করবে।
এখনও পর্যন্ত যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, তা হল ঘূর্ণিঝড়ের চেয়ে বৃষ্টির সম্ভাবনাই এই মুহূর্তে বড় বিষয়। সিস্টেমটির প্রভাবে ওড়িশা ও উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ওড়িশা এবং উত্তর উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে IMD।
এর প্রভাব থেকে পশ্চিমবঙ্গও পুরোপুরি বাইরে থাকছে না। বঙ্গোপসাগরের এই সিস্টেমের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক এলাকায় বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলবর্তী পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তুলনামূলক বেশি প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি- সিস্টেমটির সম্ভাব্য স্থলভাগে প্রবেশ পশ্চিমবঙ্গে নয়। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলই সম্ভাব্য ল্যান্ডফল এলাকা। ফলে বাংলায় সরাসরি ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার পূর্বাভাস এই মুহূর্তে নেই। বাংলার ক্ষেত্রে মূল আশঙ্কা হল এর পরোক্ষ প্রভাব- বৃষ্টি, বজ্রবিদ্যুৎ এবং দমকা হাওয়া।
আবহবিদদের নজর এখন তাই দুটো বিষয়ের দিকে। প্রথমত, সমুদ্রের উপর থাকা অবস্থায় সিস্টেমটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর আরও শক্তি সঞ্চয় করে কি না। দ্বিতীয়ত, তার গতিপথে কোনও পরিবর্তন আসে কি না। বর্তমান মডেল ও IMD-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, সিস্টেমটি অন্ধ্রপ্রদেশ-ওড়িশা উপকূলের দিকে এগোচ্ছে।
আর বাংলার জন্য বার্তা হল, ঘূর্ণিঝড় সরাসরি আছড়ে পড়ার পূর্বাভাস না থাকলেও ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পরিস্থিতি নজরে রাখার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের উপকূল ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে আবহাওয়ার পরিবর্তন বেশি অনুভূত হতে পারে।