
খড়্গপুরে পুরসভার বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে, এবার সেই সংঘাতের আঁচ পৌঁছে গেল সরাসরি পুলিশের দোরগোড়ায়। শুধু পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নয়, প্রয়োজনে পুলিশের বিরুদ্ধেই মামলা করার হুঁশিয়ারি দিলেন রাজ্যের এক মন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, পুলিশ নিজের সীমার মধ্যে থাকুক। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনে অকারণে লাঠিচার্জ করলে তার ফল ভালো হবে না। এমনকী, পুলিশের অতি সক্রিয়তার বিরুদ্ধে আরও বড় আন্দোলনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কোথায়? যে সরকার এখন রাজ্যে ক্ষমতায়, সেই সরকারের প্রশাসনের বিরুদ্ধেই কেন এত কড়া অবস্থানের হঁশিয়ারি নিচ্ছেন শাসকদলের মন্ত্রী?
ঘটনার সূত্রপাত খড়্গপুর পুরসভায়। দুদিন আগে পুরসভার সামনে বোর্ড গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবাদে নামে বিজেপি। অভিযোগ, সেই অবস্থান-বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের উপর আক্রমণের অভিযোগ ওঠে, পাল্টা পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এরপর কয়েকজন বিজেপি কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এবার মুখ খুলেছেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, খড়্গপুরে আগে পুলিশকে এইভাবে আক্রমণাত্মক হতে দেখা যায়নি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ নিজের মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ করেছে বলে দাবি তাঁর।
দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা ভেবেছিলেন, সরকার বদলানোর পর পুলিশের ব্যবহার হয়তো বদলাবে। কিন্তু খড়্গপুরের ঘটনায় তাঁরা উল্টো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর দাবি, পুলিশ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে এবং রাজনৈতিক আন্দোলন সামলাতে গিয়ে এমন আচরণ করেছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, পুলিশকে অবশ্যই দায়িত্ব পালন করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বিনা কারণে লাঠিচার্জ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, এভাবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। আর সেই উত্তেজনার দায় শেষ পর্যন্ত পুলিশের উপরেই এসে পড়বে।
কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হল পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করার হুঁশিয়ারি। সাধারণত রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দলগুলি সেই অভিযোগে আন্দোলনও করে। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি আলাদা। দিলীপ ঘোষ রাজ্যের মন্ত্রী, অর্থাৎ প্রশাসনের অংশ। সেই জায়গা থেকে তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে, প্রয়োজনে তাঁরাও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরকারের ভিতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে? নাকি দিলীপ ঘোষ রাজনৈতিকভাবে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করতে চাইছেন? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য খড়্গপুর পুরসভার বোর্ড গঠনের পটভূমি জানা জরুরি।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, খড়্গপুর পুরসভার বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। তাঁর অভিযোগ, যে দলকে মানুষ পুরসভা চালানোর দায়িত্ব দিয়েছিল, তারা এক বছরও স্থায়ীভাবে বোর্ড পরিচালনা করতে পারেনি। তৃণমূলের বোর্ডকে তৃণমূলের সরকার সরিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এরপর যিনি দায়িত্বে এসেছিলেন, তাঁকেও নাকি তাঁর নিজের দলের লোকেরাই সরিয়ে দিয়েছেন। দিলীপ ঘোষের আরও দাবি, অযোগ্যতার কারণে বোর্ড ভেঙে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এখন আবার যাঁকে আগে সরানো হয়েছিল, তিনিই ফের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর বক্তব্য, এভাবে বারবার পুরসভার নেতৃত্ব বদল হলে মানুষের রায়কে অসম্মান করা হয়। নাগরিক পরিষেবা এবং পুরসভার কাজকর্মের বদলে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইই বড় হয়ে ওঠে।
তবে দিলীপ ঘোষের এই অভিযোগগুলিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখতে হবে। পুরসভার বোর্ড কীভাবে গঠিত হয়েছে, কোন সিদ্ধান্তে কারা দায়িত্ব হারিয়েছেন, আদালতে কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—সেই বিষয়গুলি নির্দিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, খড়্গপুর পুরসভার বোর্ড গঠন নিয়ে বিজেপি নতুন করে রাজনৈতিক আন্দোলনের পথে হাঁটতে চাইছে। দিলীপ ঘোষের হুঁশিয়ারি, আবার যদি তাঁদের মতে অযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে রেখে বোর্ড গঠনের চেষ্টা হয়, তাহলে আগের থেকেও বড় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, পুরসভার বোর্ড গঠন নিয়ে সংঘাত এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং এই ইস্যুতে বিজেপি আরও জোরালো প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিতে পারে।