
তিনি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একমাত্র বাম বিধায়ক। তাঁর হাত ধরেই শূন্যের গেরো কাটিয়েছে সিপিআইএম। ইতিমধ্যেই বিধানসভায় গিয়ে শপথও নিয়েছেন তিনি। আর এখন তাঁর সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাংলার বিধানসভায় বামপন্থীদের প্রশ্নগুলিকে তুলে ধরার কঠিন লড়াই। পাশাপাশি নিজের এলাকার উন্নয়নের একটা বড় চাপও রয়েছে। আর এই সব বিষয় নিয়েই bangla.aajtak.in-এর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন ডোমকলের নতুন বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান।
প্রশ্ন: একটা সময় বামপন্থীদের ভিড় থাকত বিধানসভায়। সেখান থেকে আজ মাত্র একজন। একমাত্র বাম বিধায়ক হিসেবে বিধানসভায় যাওয়ার অনুভূতিটা কেমন?
মোস্তাফিজুর: অনুভূতি তো কিছু নয়। মানুষ যেটা গণতান্ত্রিক রায় দিয়েছে, সেটাকে মেনে নিতেই হবে আমাদের। ২১ সালে তো মানুষ একজন বাম প্রার্থীকেও পাঠায়নি। এবারে অন্তত ডোমকলের মানুষ একজন বামপন্থী বিধায়ক পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একার যে দায়িত্ব পালন করা দরকার, সেটা পালন করতে হবে। এটাই অনুভূতি। আর ৫ বছর শূন্য থাকার পর অন্তত একজন তো গিয়েছি। সেটাই ভালো। আমাদের দরদীরা গোটা রাজ্যে একটু হলেও অক্সিজেন পেয়েছে। এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।
প্রশ্ন: একজন বাম বিধায়ক হিসেবে বামপন্থীদের যে দাবিদাওয়াগুলো রয়েছে, সেটা তুলে ধরার রোডম্যাপ কী? ২০০-এর বেশি বিজেপি বিধায়কের সামনে আপনি একা, কীভাবে কথা বলবেন?
উত্তর: এটা একটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জ এবং প্রেশার। গোটা রাজ্যের একটা প্রত্যাশা রয়েছে। সবটা মিলিয়েই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি। আমি জানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। এই আত্মবিশ্বাস আছে। বাকি আমাদের বামপন্থী অনেক সমর্থক আছে। সবার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আমি যতটা পারব, চেষ্টা করে যাব।
প্রশ্ন: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও সবার কাজের মতো দাবিগুলি নিয়েই কাজ করবেন?
উত্তর: বামপন্থীদের 'কোর এজেন্ডাই' হচ্ছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। গরিব মানুষ মেহনতি মানুষের যে দাবি, সেই দাবিগুলোই রাখব। রাস্তাতে আমরা লড়াই করব। সেই লড়াইয়ের যে দাবি, সেটাই বিধানসভাতে আমি তুলব সরকারের কাছে।
প্রশ্ন: আপনি বিরোধী দলের বিধায়ক। ডোমকলের জন্য তো কাজ করতে হবে। শাসকের কাছ থেকে প্রকল্প নিয়ে আসতে পারবেন?
উত্তর: আমি ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। ১০০ শতাংশ চেষ্টা করব। ডোমকলে যা উন্নয়ন হয়েছে তা আমাদের সময় হয়েছে। কমরেড আনিসুর রহমানের হাতে উন্নয়ন হয়েছে। গত ১৫ বছর কোনও উন্নয়ন ডোমকলে হয়নি। আমাদের যতগুলো ডিপার্টমেন্টের কাজ হবে, সেই ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলব। এরপর সরকার যতটা সাহায্য করে।
প্রশ্ন: ডোমকলের ক্ষেত্রে কোন কোন কাজ প্রায়োরিটি?
উত্তর: প্রায়োরিটি আছে অনেকগুলো। সেটা হচ্ছে কয়েকটা ব্রিজ আছে, যেগুলো খুব দরকার। সেগুলো হলে সরাসরি কলকাতার সঙ্গে যাতায়াতের অনেকটা দূরত্ব কমবে। কয়েকটা হাসপাতাল একবারে অকেজো হয়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ভেঙে পড়েছে। স্কুল-কলেজের খারাপ দশা। সেগুলির পরিকাঠামোগত উন্নতি হোক। এগুলি প্রাথমিক কাজ। তারপরে ধীরে ধীরে যেমন যেমন হবে, সেই রকমভাবে এগব।
প্রশ্ন: সেই দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামনে দিয়ে গেলেন? কী কথা হল?
বিধায়ক: আমি তো হাত মেলালাম। তখন আমাকে বললেন, ভালো লড়াই করেছ। এবার বিধানসভাতেও লড়তে হবে একাই। আমি সাহায্য করব। অসুবিধা নেই। সৌজন্যতা দেখিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: শপথের পর বিমান বসুর সঙ্গে চা খাওয়ার ছবি ভাইরাল। কী টিপস দিলেন?
উত্তর: বিমানদার কাছে যাওয়া মানেই তো টিপস পাওয়া যাবে। একদম মহীরুহ বাম রাজনীতির। উনি খুব খারাপ সময় দেখেছেন। আবার ভালো সময় দেখেছেন। আবার খারাপ সময় দেখছেন। যার ফলে তিনটে পর্যায়েরই অভিজ্ঞতা আছে। যার ফলে উনি পরামর্শ দিলেন বিধানসভায় কেমনভাবে থাকতে হবে। সংসদীয় ব্যবস্থাতে সবসময় পদস্খলন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেটা যাতে না হয়, মানুষ থেকে যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ি, সেই পরামর্শগুলো দিলেন। পুরোনো দিনের কিছু গল্প শোনালেন জ্যোতি বসুর। আরও কিছু গল্প শোনালেন।
প্রশ্ন: আপনি তো এতদিন ধরে ডোমকলে রাজনীতি করছেন। এখন কলকাতার রীতিমতো যাতায়াত শুরু হয়ে গিয়েছে। ব্যস্ততা আরও বাড়বে। পরিবারকে সময় দিতে পারবেন?
উত্তর: দেখুন আমার পরিবার আমার এই রাজনৈতিক জীবনে সবসময় পাশে ছিল। আমি খুব খারাপ সময়ে রাজনীতি শুরু করেছিলাম। মানে আমরা যখন ইউনিভার্সিটি শেষ করে রাজনীতিতে পা রেখেছি, তখন বাম সরকারের চলে যাওয়ার সময়। সিঙ্গুর আন্দোলন, নন্দীগ্রাম আন্দোলন হচ্ছে। তারপরে ২০১১ সালে সরকারের পতন। খারাপ সময়েই আমাদের রাজনীতি শুরু হয়েছে। সেই সময়ে পরিবার আমার পাশে থেকেছে। তারপরে তৃণমূল সরকার মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আমি ৯ মাস আত্মগোপন করে থেকেছি। বাড়িছাড়া থাকতে হয়েছে। মামলা চলার সময় মাঠে থাকতে হয়েছে। স্টেশনে থাকতে হয়েছে। ১ মাস জেল খেটেছি। যার ফলে সবসময় পরিবার পাশে থেকেছে।
পরিবার জানে আমি পার্টির হোলটাইমার। পার্টি ছাড়া কিছু করি না বা করব না এটাই জানে। ওটা নিয়ে সমস্যা নেই। যদিও ছেলেমেয়ে খুব মিস করে। আমার স্ত্রী এসএফআই-এর রাজ্য কমিটির মেম্বার ছিল। যার ফলে ওইরকম মানসিকতা নিয়েই আমাকে বিয়ে করেছে। যখন আমাদের বিয়ে হয়, তখনও তো আমি পার্টির হোলটাইমার। কিছুই করতাম না। জেনে শুনেই বিয়ে করেছে।
প্রশ্ন: এখন আপনি বিধায়ক। ডোমকলের মানুষজন কী এখনও তাদের রানাকে চায়ের দোকানে দেখতে পাবে? আগের মতোই থাকবে জনসংযোগ?
উত্তর: প্রতিদিন দেখবে। এখনও আমি যে দিন বিধানসভায় শপথ নিয়ে আসলাম, তারপরেই চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিয়েছি। আজকেও আমি মাঠে গিয়েছিলাম। মাঠে লেবার ছিল, লেবারদের সঙ্গে একটু দেখাশোনা করলাম। এটা ছুটবে কেন? একদম আসব। ডোমকলে থাকলে সেভাবেই থাকব।
প্রশ্ন: আজ আপনি বিধানসভায় এক। এই সংখ্যা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান রেডি?
বিধায়ক: আমি কেন করব? আমার পার্টির সামনে যে রাজ্যের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তাতে রাজ্যে বামপন্থীরা ছাড়া আর মানুষের পাশে থাকবে কে? আপনি কি মনে করছেন, বিজেপির এই আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তৃণমূল দল টিকিয়ে রাখতে পারবে? তৃণমূল আদর্শগত দল? ওটা ক্ষমতা ভিত্তিক দল। বিজেপি দরজা খুলে দিলে ক'টা তৃণমূল থাকবে এ পশ্চিমবঙ্গ এ আমার ব্যক্তিগতভাবে সন্দেহ আছে। এবার লড়াইটা মূলত বামেদের সঙ্গে বিজেপির। এখন বিজেপি সরকারের হানিমুন পিরিয়ড চলছে। কর্পোরেটমুখী যে চিন্তাভাবনা, সেই চিন্তাভাবনা তো পশ্চিম বাংলাতে প্রয়োগ করবেই। তখন মানুষের রুটি রুজির কথা তো বামপন্থীদেরকেই বলতে হবে। সেই সম্ভাবনার দুয়ারটা বামপন্থীদের সামনে খুলে গিয়েছে। রাস্তার লড়াইতে বামপন্থীরা ছাড়া মনে হয় না আরও কোনও রাজনৈতিক দল থাকবে।