Advertisement

সরকার বদলাতেই কোচবিহার সীমান্তে কড়াকড়ি, অব্যাহত কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ

কোচবিহারের সীমান্ত এখন আর শুধু কাঁটাতারের লাইন নয়। এটা এখন এক নতুন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে একদিকে চোরাচালানকারীরা, আর অন্যদিকে রাজ্য পুলিশ, বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ শক্তি। সাহেবগঞ্জ থানার কুশাহাট এলাকায় যা ঘটল, তা নিছক রুট মার্চ নয়। এটা স্পষ্ট বার্তা —

সরকার বদলাতেই কোচবিহার সীমান্তে কড়াকড়িসরকার বদলাতেই কোচবিহার সীমান্তে কড়াকড়ি
স্বপন কুমার মুখার্জি
  • কোচবিহার,
  • 24 May 2026,
  • अपडेटेड 5:02 PM IST


কোচবিহারের সীমান্ত এখন আর শুধু কাঁটাতারের লাইন নয়। এটা এখন এক নতুন রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে একদিকে চোরাচালানকারীরা, আর অন্যদিকে রাজ্য পুলিশ, বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ শক্তি। সাহেবগঞ্জ থানার কুশাহাট এলাকায় যা ঘটল, তা নিছক রুট মার্চ নয়। এটা স্পষ্ট বার্তা —

'এবার নিয়ম বদলেছে, খেলা আর আগের মতো হবে না'
রাজ্য পুলিশ, বিএসএফ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী একসঙ্গে সীমান্তে টহল দিল। সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হল সরাসরি কড়া ভাষায় — 'কান খুলে শুনে রাখ, পালিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না।' এই ভাষা শুধু সতর্কতা নয়। এটা এক ধরনের ঘোষণা। কারণ সীমান্ত মানেই শুধু ভৌগোলিক রেখা নয়। সীমান্ত মানে অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা, আর সবচেয়ে বেশি — অবৈধ বাণিজ্যের একটা জটিল জাল। জিরে থেকে শুরু করে মাদকদ্রব্য, গবাদি পশু থেকে নানা পণ্য — সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের অভিযোগ বহুদিনের।

আর সেই চোরাচালানের অভিযোগকে ঘিরেই বছরের পর বছর রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। Sকদিকে অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সীমান্ত দিয়ে বেআইনি ব্যবসা চলছে। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য প্রশাসনের সমন্বয় ঠিকমতো হচ্ছে না। এই টানাপোড়েনের মাঝেই এখন নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে — যৌথ বাহিনীর সক্রিয়তা। কুশাহাটে রুট মার্চ সেই পরিবর্তনের প্রতীক। সেখানে স্পষ্টভাবে বার্তা দেওয়া হয়েছে, কাঁটাতারের বেড়া ভেঙে, ঢিল মেরে, বা পোটলা ছুড়ে চোরাচালান করার দিন শেষ। এখন নজরদারি আরও কড়া হবে, যৌথ টহল বাড়বে, এবং তথ্য আদান-প্রদান আরও দ্রুত হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে — হঠাৎ এই কঠোরতা কেন? রাজনৈতিকভাবে এই প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমান্ত নিরাপত্তা সবসময়ই কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কের একটা সংবেদনশীল ক্ষেত্র। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, সীমান্তে বিএসএফের ভূমিকা নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের টানাপোড়েন হয়েছে। বিশেষ করে জমি দেওয়া, কাঁটাতার বসানো, এবং বিএসএফের কার্যক্ষমতা নিয়ে মতভেদ ছিল। একসময় রাজ্য সরকারের তরফে অভিযোগ উঠেছিল, সীমান্তে অতিরিক্ত কড়াকড়ি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। আবার কেন্দ্রের দাবি ছিল, সীমান্ত দুর্বল থাকলে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ বাড়বে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই এবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রশাসনিক অবস্থানে এসে এখন বলা হচ্ছে, বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশ একসঙ্গে কাজ করবে। গোয়েন্দা তথ্য ভাগ হবে, যৌথ টহল চলবে, এবং সীমান্ত এলাকায় সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে। অর্থাৎ পুরনো বিরোধের জায়গায় এখন 'সহযোগিতা'র ভাষা। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

Advertisement

কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, মালদা, মুর্শিদাবাদের সীমান্ত এলাকাগুলোতে চোরাচালান শুধু অপরাধ নয়, অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি তৈরি হয়েছে — যা বৈধ নয়, কিন্তু বাস্তব। তাই যখন যৌথ বাহিনী কড়া বার্তা দেয়, তখন একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা শক্তিশালী হওয়ার আশা তৈরি হয়, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তাও বাড়ে। কারণ যেকোনও কঠোর অভিযান সরাসরি প্রভাব ফেলে সীমান্ত এলাকার ছোট ব্যবসা, পরিবহন, এমনকি স্থানীয় বাজারেও। তবুও প্রশাসনের বক্তব্য স্পষ্ট — আইন সবার জন্য সমান হবে। বিএসএফের ৩ নম্বর ব্যাটেলিয়ান-সহ কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের যৌথ উপস্থিতি সেই বার্তাকেই আরও জোরদার করেছে।

রুট মার্চের সময় সাধারণ মানুষকে সরাসরি সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কাঁটাতারের উপর দিয়ে পণ্য পাঠানো, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পারাপার, বা অবৈধভাবে কিছু পাচার করার চেষ্টা করলে এবার আর সহজে রেহাই মিলবে না। এই কড়া ভাষা অনেকের কাছে নতুন। কারণ সাধারণত প্রশাসনিক বার্তা এত সরাসরি এবং হুঁশিয়ারির সুরে বলা হয় না। কিন্তু এবার বলা হয়েছে — 'কান খুলে শুনে রাখ।' এই ধরনের ভাষা আসলে শুধু অপরাধীদের উদ্দেশে নয়, এটা একটা মানসিক বার্তাও।

বার্তাটা হল —'রাজ্য বদলেছে, নিয়ম বদলেছে'
এখানেই রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শুরু হয়। কারণ সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানো যতটা প্রশাসনিক বিষয়, ততটাই রাজনৈতিক বার্তাও। এটা দেখানোর চেষ্টা যে এখন আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে কোনও ছাড় নেই, কোনও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করবে না। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন থাকে — এই কঠোরতা কতটা স্থায়ী? কারণ সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করা শুধু টহল বাড়ালেই হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সমাধান — স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা, বিকল্প জীবিকা তৈরি করা, এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। না হলে কড়াকড়ি সাময়িকভাবে অপরাধ কমালেও, পরে আবার নতুন রূপে ফিরে আসে। কোচবিহারের মতো সীমান্ত এলাকায় বহুদিন ধরেই একটি অভিযোগ রয়েছে — মাঝেমধ্যেই অভিযান হয়, আবার কিছুদিন পর পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কঠোরতা নিয়ে সন্দিহান থাকে।

তাই এবার যৌথ বাহিনীর এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। আরও একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ — রাজনৈতিক ভাষা। 'পালিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না' — এই ধরনের ভাষা সাধারণত যুদ্ধকালীন বা কঠোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা সেই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রশাসনে ভাষার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা শুধু বার্তা দেয় না, এটা মানসিকতাও তৈরি করে। তবুও এটাও সত্যি, সীমান্তে চোরাচালান বহু মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। মাদক, অস্ত্র, এবং অবৈধ পণ্যের প্রবাহ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক বিপদও তৈরি করে। এই কারণেই প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে অনেকেই স্বাগতও জানাচ্ছেন। তাদের মতে, এতদিন সীমান্তে যে ফাঁকফোকর ছিল, তা বন্ধ হওয়া দরকার। না হলে আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে এখানে ভারসাম্যের প্রশ্ন থেকেই যায়। কড়াকড়ি দরকার, কিন্তু সেটা যেন মানবিক এবং স্থায়ী সমাধানের দিকে নিয়ে যায়। শুধুমাত্র ভয় দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না। বাংলার সীমান্ত রাজনীতি তাই এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে যৌথ বাহিনীর কঠোরতা, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের বাস্তবতা — এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আসল চ্যালেঞ্জ। কুশাহাটের রুট মার্চ হয়তো আপাতদৃষ্টিতে একটা সাধারণ নিরাপত্তা অভিযান। কিন্তু এর বার্তা অনেক বড়। এটা শুধু চোরাচালানকারীদের উদ্দেশে নয়, এটা গোটা সীমান্ত ব্যবস্থার উদ্দেশেও একটা সতর্ক সঙ্কেত। কারণ এখন স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে — সীমান্তে নিয়ম ভাঙার দিন শেষ। কিন্তু সেই নিয়ম কতটা কার্যকর হবে, আর কতটা টেকসই হবে — সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Advertisement

রিপোর্টারঃ মনসুর হাবিবুল্লাহ

Read more!
Advertisement
Advertisement