
পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও নির্বাচনেই মুসলিম ভোটের অঙ্ক কষতেই হয়। যে রাজ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট, সেখানে এই সম্প্রদায় অবশ্যই বড় ফ্যাক্টর। দীর্ঘ ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে রাইটার্স হোক বা নবান্ন, মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের উপর ভর করে মুখ্যমন্ত্রী নির্ধারিত হয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সে ক্ষেত্রে ভিন্ন উদাহরণ। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনেও মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে অঙ্কের কাটাছেঁড়া চলছে। রেজিনগরে যেমন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই স্বীকার করছেন, ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোট, ৩০ শতাংশ হিন্দু ভোট।
মুসলিম ভোট বিরোধীদের দিকে কীভাবে যাবে?
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচন ৬ অক্টোবর। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম উপনির্বাচন। সাধারণত উপনির্বাচনে শাসকদলই জিতে যায়। কিন্তু এই দুই উপনির্বাচন ঘিরে রাজ্য রাজনীতি তপ্ত। যেমন মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে ৬৫ শতাংশ মুসলিম ভোট। আবার নন্দীগ্রামে এতটা বেশি না হলেও, মুসলিম জনসংখ্যা খুব কমও নয়। তবে নন্দীগ্রাম অধিকারী পরিবারের গড়। এখন প্রশ্নটা এটা নয় যে, মুসলিম ভোট বিজেপি টানতে পারবে কিনা, প্রশ্নটা হল, মুসলিম ভোট বিরোধীদের দিকে কীভাবে যাবে।
২০২৬ সালে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভোট পেয়েই বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ক্ষেত্রে কিন্তু হিন্দু ভোটটা নিয়ে ফ্যাক্টর নয়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায়, হিন্দু ভোট সিংহভাগই বিজেপির দখলে থাকবে, তাহলে মুসলিম ভোটের দাবিদার তো একাধিক দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস আছে। রেজিনগরে তো হুমায়ুন কবীরের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও রয়েছে। রেজিনগরে হুমায়ুনের ছেলেই প্রার্থী।
বিজেপি-র মুসলিম ভোট প্রয়োজন নেই
২০২৬ সালে কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ রেজাল্ট দেখা গিয়েছে। ২১৫ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের আসন কমে ৮০ হয়েছে। মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরে ভোট স্যুইং চোখে পড়ার তো। যেমন ধরুন বেলডাঙা, ৬৩ শতাংশ মুসলিম ভোট। ২০২১ সালে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৬ সালে তা মে হয়ে গেল ২৬.১ শতাংশ, AJUP পেল ২০.৪ শতাংশ, কংগ্রেস পেল ১৭.৫ শতাংশ। বিজেপি ৩৯.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে গেল। অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-র মুসলিম ভোট প্রয়োজন নেই। কিন্তু মুসলিম ভোট বিভাজনের প্রয়োজন রয়েছে। ফরাক্কা ও রানিনগরে কংগ্রেস জিতেছে। ডোমকল আসন পেয়ে CPI(M) শূন্যের গেরো থেকে বেরিয়েছে। জলঙ্গিতে ২০২১ সালে যেখানে ৭৯ হাজার ভোটের লিডে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, ২০২৬ সালে তা কমে হয়ে গেল ২১ হাজার ৫০০। এর নির্যাস কিন্তু মুসলিমরা হঠাত্ করে বিজেপি-প্রেমী হয়ে গিয়েছেন, তা নয়। রেজিনগর ও নওদায় দেখা গিয়েছে, হুমায়ুনের AJUP ভোট শতাংশের নিরিখে তৃণমূল কংগ্রেসকে ৩ নম্বরে ঠেলে দিয়েছে।
এ বার আসা যাক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রসঙ্গে। ৮০ জন বিরোধী বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়ক রয়েছেন ঋতব্রত শিবিরে। ওই বিধায়কদের অনেকেই এমন সব আসন থেকে নির্বাচিত, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সরকারের বিরুদ্ধে তাঁরা কতটা সরব হয়েছেন, তা মানুষ নিজের চোখেই দেখেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ বিরোধী অবস্থান কখনও এমন একটি সতর্ক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
বিদ্রোহী বিধায়কেরা নিজেদের এলাকায় এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারেন। কিন্তু মুসলিম-অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় ভোটের মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ এদিক ওদিক হলেই বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ধাক্কা খেতে পারে। পুরনো তৃণমূলের থেকে আলাদা করে এই গোষ্ঠীর রাজ্যজুড়ে কোনও সংগঠন নেই, এটা তো স্পষ্ট। যে সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে, তা এখনও মমতার নিয়ন্ত্রণেই।
তাহলে কি উপনির্বাচনে কংগ্রেসের ফায়দা হতে পারে?
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনে একমাত্র কংগ্রেসই এমন দল, যাদের মুসলিম ভোটে সামান্য ড্যামেজ হয়েছে। নন্দীগ্রামে মতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওদিকে ঋতব্রতদের শিবিরের প্রার্থী মহম্মদ এহেতাশ মুল হক। কলকাতার বাসিন্দা, এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা এখনও বেশ সীমিত এবং বিচ্ছিন্ন। এরপরে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারিতে আবেগ খানিকটা কংগ্রেসের দিকেই বইছে। নন্দীগ্রামে বিজেপি-র বিরুদ্ধে একমাত্র কংগ্রেসই লড়ছে। সে ক্ষেত্রে মুসলিম ভোট একত্রে কংগ্রেসের দিকে যেতে পারে। যদিও ওই আসনে মুসলিম ভোট এককভাবে পেলেও জেতা সম্ভব নয়।
রেজিনগরের বিষয়টা আবার অন্যরকম। সেখানে ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে হুমায়ুন কবীর জিতেছিলেন। উপনির্বাচনে তাঁর ছেলে গোলাম নবী আজাদ দাঁড়িয়েছেন AJUP-র প্রতীকে। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসও প্রার্থী দিয়েছে আলাদা করে। মাত্র ৫ মাস আগেই AJUP এই আসনে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জিতেছিল। ১৯৯৮ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন, তখন থেকেই মুসলিম ভোট টার্গেট করেন। মালদা, মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক টেনে নেন তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান জনগণের সিংহভাগই বাম ও তৃণমূল কংগ্রেস আমলই দেখেছে। এখন মুসলিম সমাজকে বেছে নিতে হচ্ছে, দুর্বল হয়ে পড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দেহের চোখে দেখা তৃণমূলের একটি গোষ্ঠী, যে বিজেপিকে তারা ভয় পায়, আর বহু বছর আগেই পিছনে ফেলে আসা বামেদের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতেই কংগ্রেসের এখনও কিছুটা রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। কংগ্রেস যদি শুধু কোনও জেলার পুরনো স্মৃতি হয়ে না থেকে গোটা রাজ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারে, তা হলে দিশাহীন হয়ে পড়া মুসলিম ভোটের একটা বড় অংশ তাদের দিকে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
হুমায়ুন কবীর, নওশাদ সিদ্দিকি ও অন্যান্যরা
রেজিনগরে কিন্তু হুমায়ুন কবীর ফ্যাক্টর। না, শুধু জিতেছেন বলে নয়, তাঁর ছেলে উপনির্বাচনে প্রার্থী। তবে রেজিনগর ও নওদার বাইরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা খুব বেশি নয়। তিনি মুর্শিদাবাদের কোনও একটি আসনে ভোট ভাগ করতে পারেন, কিন্তু সেই প্রভাব গোটা বাংলায় ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন। অন্যদিকে, নওশাদ সিদ্দিকির ISF-এর প্রভাব মূলত ভাঙড়কেন্দ্রিক। নিজেদের এলাকায় এই নেতাদের জনপ্রিয়তা থাকলেও গোটা রাজ্যে মুসলিম ভোটের বড় অংশ টানতে যে ধরনের সংগঠন ও রাজনৈতিক পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা তাদের নেই।