
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামাতো ভাই নিহার মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের রহস্যমৃত্যু। মঙ্গলবার সকালে রামপুরহাটের কুশম্বা গ্রামের বাড়ির দোতলার ঘর থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কী কারণে তাঁর মৃত্যু, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন
পরিবারের অভিযোগ, বৃষ্টি মুখোপাধ্যায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। জানা যাচ্ছে, তিনি গত ৪,৫ বছর ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসাও চলছিল। প্রসঙ্গত, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে নাম জড়ানোয় গ্রুপ সি-র চাকরিটি হারিয়েছিলেন বৃষ্টি। সম্প্রতি বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা নিয়ে আরও হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন। বৃষ্টি মুখোপাধ্যায় নিজের গলায় ফাঁস দিয়ে চরম পদক্ষেপ করেছেন বলে মনে করছে পুলিশ ৷
প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা বলে অনুমান
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিজেই নিজেকে শেষ করার বিষয়টি সামনে আসছে ৷ তবে ঠিক কী কারণে বৃষ্টি চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা এখনও স্পষ্ট নয় । বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের বাবা নীহার মুখোপাধ্যায় জানান, 'মেয়ে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিল । আমরা নিয়মিত ডাক্তার দেখাতাম । আজ কিছুই জানি না কী ভাবে এসব হল । আমরা তখন বাড়ির নীচের তলায় ছিলাম।' ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে রামপুরহাট থানার পুলিশ। আপাতত দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বাপের বাড়িতেই ছিলেন বৃষ্টি
কয়েক মাস ধরে তিনি বাপের বাড়িতেই থাকছিলেন বলে খবর। পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, সকালে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করা হয়। দরজা না খোলায় থানায় খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে দেহ উদ্ধার করে। এর আগে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। বোলপুর হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণির কর্মী বৃষ্টির নাম ‘অবৈধ’ ভাবে নিযুক্তদের তালিকায় ছিল। বছরখানেক আগে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় চাকরি হারান বৃষ্টি। কয়েক মাস যাবৎ স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছিল। এক সন্তানকে নিয়ে তিনি বাপেরবাড়িতেই ছিলেন।
নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ
বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ এবং গ্রুপ সি পদে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, বেআইনিভাবে বা অনিয়মের মাধ্যমে তিনি চাকরি পেয়েছিলেন । কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পর স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রকাশিত চাকরি বাতিলের তালিকায় তাঁর নামও ছিল বলে জানা গিয়েছে । তালিকায় ৬০৮ নম্বরে নাম ছিল বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের । ক্লার্ক হিসেবে বোলপুর হাইস্কুলে চাকরি পেয়েছিলেন বৃষ্টি। কিন্তু পরবর্তীতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) তরফে গ্রুপ 'সি' পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অযোগ্যদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে বৃষ্টির নাম ছিল। যদিও সেইসময় বৃষ্টির বাবা দাবি করেছিলেন, চাকরিতে যোগ দিলেও কোনও বেতন নেননি মেয়ে। নীহার মুখোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, তাঁর মেয়ে বরাবর পড়াশোনায় ভাল। নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছিলেন। কোথাও, কোনও ভাবে মেয়ের চাকরির জন্য দরবার করেননি তিনি। তবে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এসএসসি-র নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে বৃষ্টির চাকরি বাতিল হয়।
বিবাহবিচ্ছেদের মামলাও চলছিল
সম্প্রতি বৃষ্টি মুখোপাধ্যায়ের বিবাহবিচ্ছেদের মামলাও শুরু হয় আদালতে। বৃষ্টির ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট টানাপড়েনের মধ্যে ছিলেন তিনি। পরিবারের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, গত চার-পাঁচ বছর ধরে মানসিক অবসাদের জেরে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরেই নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন তিনি। পরিজনদের সঙ্গেও আগের মতো মেলামেশা করতেন না।
১২ বছরের ছেলে রয়েছে
বাড়ির এক সদস্য বলেন, 'ছেলের পৈতে হয় যখন, পার্মানেন্ট থাকতে লাগল। তার আগে হাসপাতালে ভর্তি করত আর এখানে দিয়ে যেত। ওর বর অনেকদিন আগেই বের করে দিয়েছে। ডিভোর্স করেনি। মামলা চলছে। আমরা মামলা করেছি। ১২ বছরের একটা বাচ্চা আছে।' বাপের বাড়িতে, উপরের তলার ঘরে বৃষ্টি গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েন বলে দাবি পরিবারের লোকজনের। দাম্পত্যজনিত টানাপোড়েনের কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন কি না, তা এখনই স্পষ্ট হয়নি।