
২০২১ সাল। নন্দীগ্রাম আসন থেকে লড়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়কে হারিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তাঁর কেরিয়ারের ক্ষেত্রে মাইলস্টোনের কাজ করেছিল সেই জয়। সেবার মমতাকে হারাতে না পারলে শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবন অন্য খাতে বইতে পারত। একুশের জয়ের গুরুত্ব যে তাঁর কাছে অপরিসীম তা আজ ফের বুঝিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
২০২৬ সালের বিধামনসভা ভোটে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন শুভেন্দু। এবারও দুই কেন্দ্র থেকেই জেতেন তিনি। তবে নন্দীগ্রাম ছেড়ে ভবানীপুর কেন্দ্রের জয়ী প্রার্থী হিসেবে বিধানসভায় গিয়েছেন। তা হলেও তিনি যে 'ঘরের ছেলে' হয়েই থাকবেন সেই বার্তা দিলেন নন্দীগ্রামবাসীকে। জানালেন, 'আমি আপনাদের কাছে যেমন ছিলাম তেমনই থাকব। আমি আপনাদেরই লোক। ভবানীপুরের জয়ী হিসেবে বিধানসভায় গিয়েছি বলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।'
এদিন নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর বক্তব্য জুড়ে ছিল সেই অঞ্চলের মানুষকে আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টা। তিনি প্রথমেই বলেন, 'আমাকে নির্বাচিত করার জন্য প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আজ আপনাদের কাছে এসেছি অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাতে। আপনারা ২০০৩ সাল থেকে আমাকে যে চোখে দেখেছেন, যেভাবে দেখেছেন, সেভাবেই আগামিদিনেও দেখতে পাবেন। যে শহিদ পরিবারগুলি সঙ্গে দিয়েছে, তাঁদের ধন্যবাদ। এবার তৃণমূলকে মূল-সহ উৎখাত করেছি। সেটা নিশ্চয় আপনারা বিশ্বাস করেছেন। ৭ শহিদ পরিবারকে তৃণমূল অপদস্থ করেছে। তাঁরা মাথা নত করেননি। তাঁদের ধন্যবাদ।'
মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানান, হয়তো নন্দীগ্রামের অনেকে আশঙ্কা করছেন, তাঁরা কীভাবে তাঁকে আগের মতো পাবেন। তবে সেই আশঙ্কা করার প্রয়োজন নেই। আশ্বাস দেন তিনি। তাঁর দাবি, এলাকার উন্নয়নের জন্য যাবতীয় পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি আগেই মতোই মানুষের সঙ্গে থাকবেন। বলেন, 'আপনারা শুভেন্দুকে কীভাবে পাবেন? ২০০৬ সালের নভেম্বর মাস থেকে আজ অবধি আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। তখন আপনাদের বিধায়ক ছিলাম না। তখনও সঙ্গে ছিলাম। ফিরোজা বিবি জেতার পর তিনিই এমএলএ ছিলেন। আমি তখনও ছিলাম আপনাদের সঙ্গে। ২০২১ সালে আমাকে জিতিয়েছিলেন। আপনারা ক্ষমতা দিয়েছেন আমাকে। সব পরিষেবা পাবেন। একইভাবে পাবেন আমাকে। আমার কোনও পরিবর্তন আপনাদের চোখে পড়বে না। আমি আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।'
বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি বা কেউ সমস্যা পড়লেই নন্দীগ্রাম বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছুটে যেতেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর মতো বড় দায়িত্ব সামলেও তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বলেন, '৭ জানুয়ারি ভোরবেনা ভাঙাবেড়া, ১৪ মার্চ গোকুলনগরে গিয়েছি। আবারও যাব। আপনাদের উন্নয়নের যে কাজ মমতা করেননি, আমি করব। জল এনেছিলাম। রেল আনতে গিয়েছিলাম। ৬ একর জমি দেননি মমতা। আমাকে দল বলেছিল ভবানীপুরে লড়তে। আমি ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে তাঁকে হারিয়েছি। মমতার নিজের বুথেই হারিয়েছি ওঁকে। ফিরহাদ হাকিমের পাড়াতেও আমরা জিতেছি। ভবানীপুর ধরে রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়েছি। শুভেন্দু আপনাদের সঙ্গে ছিল, আছে ও থাকবে।'
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কী কী কাজ আছে সেটাও জানান। বলেন, '৩৪ বছরের অপশাসন ও তৃণমূলের ১৫ বছরের দুর্নীতি। অনেক কাজ। অনেক স্বপ্ন। কথা ও কাজের মধ্যে বিজেপির মিল আছে। রাজ্যের যে বেহাল অবস্থা সেখান থেকে বের করে আনতে হবে সাধারণ মানুষকে। মানুষ শিল্প চায়, মহিলারা সুরক্ষা চান, পরিশ্রুত পানীয় জল, ভালো রাস্তা, ভালো সেতু, পুলিশের নিরপেক্ষতা-এই সব চায় আম আদমি। আর যেন ধর্ম পালনের জন্য কোর্টে যেতে না হয়। আমরা ধীরে ধীরে কাজ করব। হাসপাতালগুলিতে রেফার বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা পরিষেবা ভালো করতে হবে। কিছুদিনের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেব। মিথ্যা মামলা নিয়ে যা হওয়ার হবে। আইনি পথে হবে। সবকা সাথ সবকা বিকাশের সঙ্গে হিসাবও হবে। এদের জায়গা হবে জেল। আমি একটাকেও ছাড়ব না।'
রাজ্যের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সোনা পাপ্পু, রাজু নস্করদের যেভাবে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, একইভাবে কোনও দোষীকে ছাড়া হবে না। বলেন, 'শুধু দেখতে থাকুন। যারা চুরি করেছে সব বের করব। এখানে বাই ইলেকশন হবে। ফলতার মতো ব্যবধানে এখানেও বিজেপি প্রার্থীকে জেতান। এই আবেদন রাখছি।'