
অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' নীতি প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জেলায় জেলায় ডিটেনশন সেন্টারের আদলে হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশিকা জারি হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। তাতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর যাঁরা অবৈধভাবে কাঁটাতার পেরিয়ে এদেশে ঢুকেছে, তাঁদের চিহ্নিত করে এই হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। এছাড়া একই অভিযোগে এতদিন যাঁরা কারাবন্দি ছিলেন, তাঁদেরও এভাবেই হোল্ডিং সেন্টারে রাখার পর পুশব্যাক করা হবে।
প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছেন কেন্দ্রের আইন এবার রাজ্যে বলবৎ করা হবে ও অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। অনুপ্রবেশকারীদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সব জেলা শাসকদের। যে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গারা ২০২৪-এর ৩১ ডিসেম্বরের পরে ভারতে এসেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে এই হোল্ডিং সেন্টারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এরাজ্যে সংশোধনাগার থেকে যে সব অনুপ্রবেশকারী ছাড়া পাবেন, তাঁদেরকেও এই হোল্ডিং সেন্টারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোল্ডিং সেন্টার থেকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিএসএফ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। ২০২৫ সালের ২ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যে নির্দেশ দিয়েছিল, সেটা মেনেই এই বিজ্ঞপ্তি জারি করে সব জেলার প্রশাসনকে পাঠানো হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে হোল্ডিং সেন্টারগুলো কি ডিটেনশন সেন্টারের মতোই কাজ করবে? এই নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
২০২৫-এর ২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করে, আটক ও প্রত্যর্পণের জন্য নতুন নির্দেশিকা জারি করে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ রাজ্যে তৃণমূল সরকার সেই নির্দেশ কার্যকর করেনি। এবার বিজেপি ক্ষমতায় এসে নির্দেশ কার্যকর করেছে। সূত্রের খবর, বিভিন্ন জেলায় থাকা কৃষক মান্ডি বা স্কুলগুলোতেই ডিটেনশন সেন্টারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আলাদা কোনও ঘেরাটোপ থাকবে না। তবে, ওই সেন্টারে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা বাইরে অবাধ বিচরণ করতে পারবেন না। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার সময় ধরা পড়া বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি) সংগ্রহ করে সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠাতে হবে। এই সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের Foreigners Identification Portal (FIP)-এ আপলোড করতে হবে। প্রতিটি জেলায় অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের শনাক্ত ও প্রত্যর্পণের জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF) গঠন করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশিকায়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই অনুসারে, সরকারি আদেশ অনুযায়ী, এই হোল্ডিং সেন্টারগুলি অস্থায়ী ট্রানজিট সুবিধা হবে। এর উদ্দেশ্য কাউকে স্থায়ীভাবে আটক করা নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের আটক রাখা। নির্দেশিকা অনুসারে, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের এই হোল্ডিং সেন্টারগুলিতে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। এই সময়ে, তাদের নাগরিকত্ব এবং নথি যাচাই করা হবে। নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জেলাশাসক বা সমতুল্য পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক।
হোল্ডিং সেন্টারগুলি ডিটেনশন সেন্টারের মতো কাজ করবে
এই কেন্দ্রগুলিতে আটক ব্যক্তিদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এই তথ্য একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করা হবে। শনাক্তকরণের পর, এই অবৈধ অভিবাসীদের নির্বাসনের জন্য সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। এতে এটা স্পষ্ট যে, এই কেন্দ্রগুলি এক অর্থে ডিটেনশন সেন্টারের মতো কাজ করবে, যেখান থেকে সরাসরি নির্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন যে, অবৈধ অভিবাসীদের আটক করার পর রাজ্য পুলিশকে আর দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে হবে না। রাজ্য পুলিশ আটককৃত অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিএফ) সঙ্গে সমন্বয় করবে।
কেউ যদি নিজেকে নাগরিক বলে দাবি করে
সন্দেহভাজন ব্যক্তি যদি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেন, তবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা জেলার কাছে যাচাইয়ের জন্য তথ্য পাঠাতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে যাচাই করে সেই তথ্য জমা দিতে হবে প্রশাসনের কাছে। সেই সময় পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। অবৈধ প্রমাণিত হলে ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করতে না পারে। প্রত্যর্পিত ব্যক্তিদের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এই তথ্য UIDAI, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থাকে দেওয়া হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট পরিচয়পত্র বা সরকারি সুবিধা বাতিল করা যায়।
প্রত্যর্পণের জন্য পরিবহণের প্রাথমিক খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে, পরে কেন্দ্রের কাছ থেকে ফেরত পাবে। তবে হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনার সম্পূর্ণ ব্যয় রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।
CAA এবং অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য
শুভেন্দু সরকার উদ্বাস্তু এবং অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, 'যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতার বাইরে, তাঁদের সকলকেই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হবে। রাজ্য পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে।'
অসমেও হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল
বাংলার আগে অসমেও বিদেশি নাগরিক ও সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীদের রাখার জন্য হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছিল।