
সেপ্টেম্বরের শেষলগ্নে আবহাওয়ায় বড় ধরনের পটপরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। উত্তর আন্দামান সাগর এবং সংলগ্ন পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগরে শক্তি সঞ্চয় করে তৈরি হওয়া নিম্নচাপটি ক্রমাগত পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর সোমবারের মধ্যে এটি গভীর নিম্নচাপ এবং পরবর্তীতে মঙ্গলবার অতি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে চলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বাংলার আবহাওয়ায়।
আজ থেকেই বৃষ্টি
বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের উপরে ঘনীভূত হওয়া নিম্নচাপের জেরে বাংলা জুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা। আজ, ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আগামীকাল, মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বেশি বৃষ্টি হবে উপকূল ও লাগোয়া পশ্চিমাঞ্চলে। একদিকে যেমন উত্তরবঙ্গ-সিকিমে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, তেমনই কলকাতা-হাওড়াতেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
নিম্নচাপের বর্তমান অবস্থা
আলিপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ গভীর নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে। মঙ্গলবার অতি গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত। বুধবার সকালে অন্ধ্র-ওড়িশা উপকূলে পৌঁছবে এই নিম্নচাপ। হাওয়া অফিসের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন উত্তর আন্দামান সাগরের ওপর অবস্থিত নিম্নপটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আজ, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ভারতীয় সময় ভোর ৫:৩০-এ পূর্ব-মধ্য ও সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের ওপর একটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এরপর এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে আজ সকাল ৮:৩০-এ পশ্চিম-মধ্য ও সংলগ্ন পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরের ওপর অবস্থান করছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্তটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭.৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের ওপর একটি নিম্নচাপে এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিম-মধ্য ও সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের ওপর গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকা এই সিস্টেমটি ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সকাল নাগাদ উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। গতকালকের উত্তর-দক্ষিণমুখী ট্রাফ (trough) রেখাটি এখন উত্তর বঙ্গোপসাগর থেকে সুস্পষ্ট নিম্নচাপের সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্তের কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩.১ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত অবস্থান করছে। উপরোক্ত আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গ উপকূল ও সংলগ্ন এলাকায় দমকা হাওয়া এবং রাজ্যের কয়েকটি জেলায় এক বা দু-এক জায়গায় ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজ্যের কিছু জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতেরও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের কোনও পূর্বাভাস দেয়নি মৌসম ভবন।
দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সতর্কতা
আবহাওয়া দফতর বলছে বঙ্গোপসাগরের ওপর তৈরি হয়েছে জোড়া ঘূর্ণাবর্ত ও নিম্নচাপ। যার জেরে প্রচুর জলীয় বাষ্প তৈরি হয়েছে। ফলে বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে রাজ্যের বেশ কিছু জেলায়। এই কয়েকদিন রোদের দেখা তো মিলবেই না, উল্টে বেশ মেঘলা থাকবে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির আকাশ। নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলবর্তী এলাকা ও পশ্চিমাঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলে ভারী বৃষ্টির সঙ্গে ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিমি বেগে দমকা বাতাসও বইবে। মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে। বুধবার বৃষ্টি হবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়ায়। পাশাপাশি পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, দার্জিলিং, জলপাইগুড়িতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারী বৃষ্টি হবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরে। লাগাতার বৃষ্টি হবে ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে। শুক্রবার বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমানে।
উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি
উত্তরবঙ্গে আপাতত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সামান্য সম্ভাবনা রয়েছে । বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ফের উত্তরবঙ্গের উপরের দিকে জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির হলুদ সতর্কতা জারি করা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টির দাপট শুরু হলেও ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে আবহাওয়ার অবনতি ঘটবে। সোমবার উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও মঙ্গলবারের পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। মঙ্গলবার মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির পাশাপাশি হালকা ঝোড়ো হাওয়ার জন্য হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এরপর বুধবার ও বৃহস্পতিবার লাগাতার বৃষ্টিতে ভিজতে পারে জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চল। বিশেষ করে আগামী শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ তার চরম রূপ নিতে পারে। ওইদিন জলপাইগুড়ির কিছু অংশে সাত থেকে কুড়ি সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুর জেলাজুড়ে ভারী বৃষ্টির হলুদ সতর্কতা বহাল রাখা হয়েছে। শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বরও জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং এবং উত্তর দিনাজপুরে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে এবং এই দিনগুলোতে উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলাতেই বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতাতেও বাড়বে বৃষ্টি
সোমবার কলকাতায় বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে। বুধবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সঙ্গে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে।
সমুদ্রে যেতে নিষেধাজ্ঞা
নিম্নচাপের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কায় মৎস্যজীবীদের সতর্ক করেছে আবহাওয়া দফতর। সোমবার থেকেই মধ্য ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। ২২ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা থাকবে। যাঁরা সমুদ্রে রয়েছে, ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছে হাওয়া অফিস।
পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা
পুরীর পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে মৌসম ভবন। আগামিকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার থেকে ভারী বৃষ্টি শুরু হবে। বুধ-বৃহস্পতিবার পুরীতে প্রবল বৃষ্টির আশঙ্কা। ইতিমধ্যেই বুধবার পুরীতে চরম ভারী বৃষ্টির লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার পুরীতে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঘণ্টায় ৫০-৬০ কিমি বেগে দমকা বাতাসও বইতে পারে। শুক্রবার থেকে বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা পুরীতে।