
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বড়সড় অনিয়মের অভিযোগ সামনে এল নদিয়ায়। জেলা প্রশাসনের তদন্তে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় কৃষ্ণনগর-২ ব্লকেই ১৭৩ জন পুরুষ নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন। এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
রাজ্যজুড়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের তথ্যভাণ্ডার খতিয়ে দেখার সময় এই অনিয়ম ধরা পড়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছিলেন, প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তালিকায় পুরুষ, নাবালক এমনকি অনুপ্রবেশকারীদের নামও ঢুকে পড়েছে। এরপরই বিভিন্ন জেলায় শুরু হয় যাচাই অভিযান।
গত ৩১ মে কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের বিডিও নদিয়ার জেলা শাসক শ্রীকান্ত পল্লীর কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেন। সেখানে বেলপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ১৭৩ জন পুরুষ সুবিধাভোগীর নাম উল্লেখ করে তাঁদের স্থায়ীভাবে প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, ব্লকের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সেলের কম্পিউটার অপারেটর এবং ধুবুলিয়ার এক তৃণমূল কর্মী ভোলা শিল অনলাইন ডেটাবেসে পুরুষদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। বর্তমানে তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাঁর মা মঞ্জু শীল দাবি করেছেন, রাজনৈতিক কারণেই তাঁর ছেলেকে টার্গেট করা হচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রায় দু'মাস আগে এই ১৭৩ জনের নাম প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ছিল।
অন্নপূর্ণা যোজনার সঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তথ্য একীভূত করার সময়ই একাধিক অসঙ্গতি নজরে আসে। এরপর বিস্তারিত তদন্তে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ভুয়ো মহিলা নাম, জাল আধার নম্বর এবং ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি ছিল পুরুষদের নামে।
তদন্তকারী এক আধিকারিক জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে বিহারের আধার নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি অভিযোগ, কয়েকটি প্রোফাইলে চলচ্চিত্র অভিনেত্রীদের ছবিও ব্যবহার করা হয়েছিল।
চিহ্নিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে বেলপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মী দীপর্ণব কর্মকারও রয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে তাঁর অ্যাকাউন্টে প্রকল্পের টাকা জমা পড়েছিল, তবে দাবি করেছেন তিনি কোনও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনের কাছে ব্যাঙ্কের তথ্য থাকায় কেউ সেই তথ্যের অপব্যবহার করে থাকতে পারে।
নদিয়া জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শুধু কৃষ্ণনগর-২ ব্লক নয়, জেলার অন্যান্য ব্লকেও একই ধরনের তদন্ত চলছে। সুবিধাভোগীদের তথ্য বিভিন্ন সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
জেলা শাসক শ্রীকান্ত পল্লী জানিয়েছেন, ১৭৩ জন পুরুষ সুবিধাভোগীকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। যাঁর দায়িত্বে তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছিল, তাঁকে শোকজ করা হয়েছে।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, শুধু মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহকুমাতেই প্রায় ৩ হাজার পুরুষ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেয়েছেন। তিনি ডিজিপিকে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বড় আর্থিক জালিয়াতির ক্ষেত্রে অর্থপাচার সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
অন্যদিকে মালদার হরিশচন্দ্রপুরেও সামনে এসেছে আরেক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। সোনাকুল গ্রামের বাসিন্দা নুরনাহার বিবির দাবি, ২০২১ সালে তিনি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করলেও গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর জন্য বরাদ্দ টাকা অন্য এক পুরুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি গোলাম মর্তুজা অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তাঁর বক্তব্য, ঋণের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হলেও তিনি নিয়মিত লেনদেন পরীক্ষা করতেন না এবং কোনও বার্তাও পেতেন না। যদি সত্যিই প্রকল্পের টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে এসে থাকে, তাহলে তিনি তা ফেরত দিতে প্রস্তুত।
ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে তথ্য যাচাই এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে। তদন্তকারীদের মতে, প্রকল্পের ডেটাবেসে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক অনিয়ম চললেও অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য পুনরায় তথ্য যাচাই শুরু হওয়াতেই সেইসব অসঙ্গতি একে একে সামনে আসছে।