
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে কুরুচিকর আক্রমণ চলছে লাগাতার। উত্তপ্ত সোশ্যাল মিডিয়া। একাধিক আপত্তিকর পোস্ট ও বিকৃত ছবি ছড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দুই ফেসবুক ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কুরুচিকর ও অবমাননাকর পোস্ট করার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন এক সমাজকর্মী। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ঘটনা ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া আসছে। বহু মানুষ নেতাজির নামে আপত্তিকর ছবি ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভারতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে এ ধরনের পোস্টে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কার বিরুদ্ধে অভিযোগ?
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকাশ রায় এবং অমিত রাজবংশী নামে দুই ফেসবুক ব্যবহারকারী নেতাজিকে নিয়ে বিকৃত (Morphed) ছবি এবং আপত্তিকর মন্তব্য সহ পোস্ট শেয়ার করেছেন।
অভিযোগকারী পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে তাদের যেন কড়া শাস্তি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করতে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আবেদন জানানো হয়েছে।
অনন্ত মহারাজের মন্তব্য থেকেই ঘটনার সূত্রপাত
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় BJP-র রাজ্যসভার সাংসদ নগেন রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের সংবাদমাধ্যমে করা একটি মন্তব্য ঘিরে। তিনি বলেন, 'কোচবিহারের মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভারত তথা সারা পৃথিবীকে স্বাধীন করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে সম্রাট বানানো হলে হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হতো না। আমাদের মহারাজাকে প্যালেসে থাকতে দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ, জল কেটে দিয়েছিল। গান্ধী-নেহরুর আন্দোলনে দেশ স্বাধীন হয়েছিল কিন্তু বাকি রাষ্ট্রগুলি কীকরে স্বাধীন হল? সেখানে কোন গান্ধী ছিলেন? কোন নেহরু ছিলেন? আমাদের মহারাজা হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে ধ্বংস করেছেন। নেতাজির বাপের শক্তি আছে নাকি আজাদ হিন্দ ফৌজ বানায়। ওগুলো সব ব্রিটিশ সৈন্য। জার্মান ওদের বন্দি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর তাদেরকেই নেতাজিকে দিয়েছিল। আর নেতাজি সেটার অপব্যবহার করেছে। আমাদের পূর্বপুরুষ কোনও আজাদ হিন্দকে সাজা দেননি।' তাঁর সংযোজন, 'সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে আমায় এনকাউন্টার করে দেবে। আর তখন তো ব্রিটিশ আমাদের শাসন করছিল, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরবে কেন আজাদ হিন্দ ফৌজ? তাদের মৃত্যুদণ্ড কেন দেওয়া হল না?'
নেতাজি সম্পর্কে তাঁর করা মন্তব্যের জেরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন অনন্ত মহারাজ। এই মন্তব্যের পর থেকেই নেতাজিকে নিয়ে একাধিক বিতর্কিত পোস্ট এবং বিকৃত ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে শুরু করে। এর জেরে নতুন করে জনতার একাংশের মধ্যে প্রতিবাদের সুর জোরালো হয়েছে। তবে BJP-র তরফে কোনও নেতা-মন্ত্রীই প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেননি। যদিও তীব্র আপত্তি জানিয়ে পোস্ট করেছেন বিধায়ক মানব গুহ।
বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর থানার এলাকার বাসিন্দা সমাজকর্মী মুনমুন চক্রবর্তী দাস গত ১ অগাস্ট ইমেলের মাধ্যমে কোচবিহারের পুলিশ সুপার (SP) এবং জেলাশাসক (DM)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠান। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিকর পোস্ট করা দুই ব্যক্তি কোচবিহার জেলার বাসিন্দা।
মুনমুন চক্রবর্তী দাস তাঁর অভিযোগে দাবি করেছেন, অভিযুক্তরা বারবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন পোস্ট করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই ধরনের পোস্ট বহু মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় আবেগে আঘাত করেছে এবং এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি মনে করছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। এই ফেসবুক প্রোফাইলগুলি থেকে ধারাবাহিকভাবে নেতাজিকে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট করা হচ্ছে। এই ধরনের পোস্ট জনরোষ, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণ হতে পারে। তাই পুলিশ প্রশাসনের কাছে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন মুনমুন।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
ইতিহাস বিকৃত করা এবং নেতাজিকে নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মত বেশিরভাগেরই। জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে গোটা ভারতেই নেতাজি শ্রদ্ধেয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানের জন্য তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। তাঁকে অপমান বা তাঁর সম্পর্কে ভুয়ো তথ্য ছড়ানোর যে কোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বলেই জানিয়েছেন এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। অন্য এক নেটিজেন অনির্বাণ বসু লেখেন, 'যারা নেতাজিকে সম্মান করে না, তারা দেশদ্রোহী।'অবশ্য এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। FIR দায়ের হয়েছে কি না, তাও এখনও স্পষ্ট নয়। এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলির মধ্যে একটি পোস্ট এখনও প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে, যদিও অভিযোগে উল্লেখিত বেশ কয়েকটি পোস্ট ও ছবি ইতিমধ্যেই মুছে ফেলা হয়েছে।