Advertisement

হিঙ্গলগঞ্জে জোর করে ধর্মান্তকরণের চেষ্টা, অভিযোগ হিন্দু জাগরণ মঞ্চের

উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন হিঙ্গলগঞ্জ থানার স্যান্ডেলের বিল এলাকায় এক বাড়িকে কেন্দ্রে করে উত্তেজনী ছড়িয়েছে। জানা গিয়েছে, স্যান্ডেলের বিলের ১১ নম্বর বাড়ির অন্দরে সুকৌশলে হিন্দু ধর্মের আদিবাসী এবং সাধারণ প্রান্তিক মানুষদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার একটি বড়সড় চক্র সক্রিয় ছিল, এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।

হিঙ্গলগঞ্জহিঙ্গলগঞ্জ
স্বপন কুমার মুখার্জি
  • কলকাতা,
  • 02 Sep 2026,
  • अपडेटेड 6:25 PM IST
  • উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন হিঙ্গলগঞ্জ থানার স্যান্ডেলের বিল এলাকায় এক বাড়িকে কেন্দ্রে করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন হিঙ্গলগঞ্জ থানার স্যান্ডেলের বিল এলাকায় এক বাড়িকে কেন্দ্রে করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। জানা গিয়েছে, স্যান্ডেলের বিলের ১১ নম্বর বাড়ির অন্দরে সুকৌশলে হিন্দু ধর্মের আদিবাসী এবং সাধারণ প্রান্তিক মানুষদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার একটি বড়সড় চক্র সক্রিয় ছিল, এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযোগের আঙুল ওঠে এমন কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে, যাঁদের পরিধানে ছিল না সাধারণ মানুষের চেনা পোশাক। অভিযোগ, এই চক্রের মাধ্যমে হিন্দু মহিলাদের হাতের পবিত্র শাঁখা, লোহা, পলা এবং সিঁদুর মুছে দিয়ে তাঁদের জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে রূপান্তরিত করার চক্রান্ত চলছিল।

খবর চাউর হতেই মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের স্থানীয় কর্মীরা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরা। সেই সন্দেহজনক বাড়িটি ঘিরে ফেলে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি এবং চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। খবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় হিঙ্গলগঞ্জ থানার পুলিশ। পুলিশ বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ওই বাড়ি থেকে সন্দেহভাজনদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশি হস্তক্ষেপে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও এলাকায় উত্তেজনা কমেনি। বরং এই ঘটনার গভীরে লুকিয়ে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো এক এক করে সামনে আসতে শুরু করেছে। 

স্থানীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের একাংশ চাঞ্চল্যকর দাবি করে জানিয়েছেন যে, ওই নির্দিষ্ট বাড়িটি দেখে মোটেও কোনও সাধারণ পারিবারিক বাসস্থান বলে মনে হয় না। বাড়িটির ভেতরে রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট আলাদা ঘর এবং প্রতিটা ঘরে রয়েছে খাট ও বিছানা। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, প্রতি সপ্তাহেই সেখানে কলকাতা, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, এমনকি বিদেশ থেকে আসা লোকজনেরও নিয়মিত আনাগোনা রয়েছে। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা—সহ পৃথিবীর নানা দেশ থেকে বিদেশি মিশনারি বা প্রতিনিধিরা ওই এলাকায় যাতায়াত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের মনে প্রশ্ন জেগেছে, সুদূর ইউরোপ বা ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ কেন সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে এমন তৎপরতা চালাচ্ছেন? হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বসিরহাট জেলার সদস্য সুশোভন দাস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে প্রশাসনের কাছে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, যতদিন না পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, ততদিন তাঁরা থানা চত্বর ছাড়বেন না। প্রয়োজনে আরও বড় জমায়েত করে বড় ধরনের ডেপুটেশন বা আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে তাঁরা হুমকি দিয়েছেন। 

Advertisement

হিঙ্গলগঞ্জের এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তর ২৪ পরগনার এই জনপদেই আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। অভিযোগের তির এবার হাসনাবাদের রূপমারি বাজারের এক মহিলার দিকে। রিনা মণ্ডল নামের ওই মহিলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রায় ১০ থেকে ২০ বছর ধরে একটি খ্রিস্টান স্কুল চালানোর অন্তরালে গোপনে ধর্মান্তরণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ওই মহিলা সুকৌশলে শিক্ষার প্রসারের নাম করে দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ছোট ছোট শিশুদের মধ্যে খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিভাজন ছড়িয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ দরিদ্র পরিবারের অবুঝ শিশুদের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে গিয়ে ওই তথাকথিত স্কুলের সামনে তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। অবিলম্বে এই খ্রিস্টান স্কুল চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলা হয়। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্কুলের মূল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং স্লোগান দিতে শুরু করেন। স্থানীয় স্তরে এই ধরনের স্কুল বা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন কোথায়, কীভাবে দিনের পর দিন এই কর্মকাণ্ড চলল এবং এর পেছনে কোনো বড় আর্থিক মদত বা বিদেশি ফান্ড কাজ করছে কি না—তা নিয়ে এখন তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে।

হিঙ্গলগঞ্জের ওই বাড়িতে বিদেশিদের যাতায়াত এবং জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা বা অন্যান্য দেশের নাম জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি এই ঘটনাকে নিছক একটি স্থানীয় অপরাধের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিতর্কে পরিণত করেছে। প্রশ্ন উঠছে, সুদূর বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিরা সুন্দরবনের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কী উদ্দেশ্যে আসেন? তাঁরা কি শুধুই ধর্মীয় প্রচার করতে আসেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সুদূরপ্রসারী গোপন অভিসন্ধি রয়েছে? গোয়েন্দা সূত্রে অতীতেও এমন বহু তথ্য সামনে এসেছে যেখানে দেখা গেছে যে, ভারতের প্রত্যন্ত উপজাতি ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে বিদেশি এনজিও বা মিশনারি সংস্থার নামে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা বা ফান্ডিং আসে। সেই অর্থের একটা বড় অংশ খরচ হয় সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচির পেছনে। সমালোচকদের দাবি, এই সমস্ত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য থাকে প্রান্তিক মানুষকে তাদের শেকড়, সংস্কৃতি এবং সনাতন ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য কোনো বিশ্বাসের দিকে ধাবিত করা।

এই পুরো ঘটনার ক্ষেত্রে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মতো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের রাজনীতিতে এই ধরনের সংগঠনগুলো বরাবরই ধর্মান্তরণ বিরোধী লড়াইকে তাদের মূল এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, সুপরিকল্পিতভাবে ভারতের সনাতন সংস্কৃতি, বেদ, পুরাণ, মহাভারত এবং উপনিষদের আদর্শকে হেয় প্রতিপন্ন করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আদিবাসী এবং হিন্দু সমাজকে দুর্বল করার জন্য এটি একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী রাজনৈতিক দল বা বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মতে, এই ধরনের প্রতিবাদ অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে উসকে দেয়। কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা বা শিক্ষা প্রসারের মতো ভালো উদ্যোগকেও অনেক সময় রাজনৈতিক বা আদর্শগত কারণে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তবে হিঙ্গলগঞ্জের ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিকাঠামো—যেমন ছোট ছোট অসংখ্য ঘর এবং খাট-বিশ্রামের ব্যবস্থা—উদ্ধার হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনেও গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এটি কি কেবলই একটি ধর্মীয় প্রার্থনা সভা ছিল, নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু চলত, তা খতিয়ে দেখার ভার এখন পুরোপুরি পুলিশের ওপর।

Advertisement

এই সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুন্দরবনের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বা রেমালে সর্বস্ব হারানো এই মানুষগুলোর কাছে দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাড় করাই যখন মূল লড়াই, তখন ধর্ম বা বিশ্বাসের লড়াই তাদের কাছে অনেক সময় গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই দুর্বলতার সুযোগই কিছু অসাধু চক্র নেয় বলে অভিযোগ ওঠে। গ্রামবাসীদের একাংশ জানাচ্ছেন, পেটের দায়ে বা সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য ও ত্রাণের লোভে অনেক সময় সরলমনা মানুষগুলো এই চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে যখন বিষয়টি জানাজানি হয়, তখন সমাজে তীব্র বিভাজন তৈরি হয়। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। গ্রামের শান্ত পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। হিঙ্গলগঞ্জ বা হাসনাবাদের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, গ্রামীণ বাংলার অন্দরে সামাজিক সম্প্রীতি কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

হিঙ্গলগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়া এবং পুলিশ কর্তৃক সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা করেছে। কিন্তু স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হলে প্রশাসনকে শুধু সাময়িক পদক্ষেপ নিলে চলবে না। এই চক্রের মূল হোতারা কারা, তাদের সঙ্গে দেশ বা বিদেশের কোন কোন সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে, কীভাবে এই অবৈধ বা সন্দেহজনক কার্যকলাপ দিনের পর দিন রানীনগর বা হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল—তার একটি নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একইসঙ্গে হাসনাবাদের রূপমারি বাজারে যে স্কুলটিকে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠেছে, সেই স্কুলের বৈধতা কতখানি, সরকারের শিক্ষা দপ্তরের কোনো অনুমতি সেখানে ছিল কি না এবং যদি না থাকে তবে এতদিন ধরে তা কীভাবে চলল, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন এবং শিক্ষা দপ্তরের। আইনের শাসন বজায় রাখতে হলে একদিকে যেমন কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না, তেমনই অন্যদিকে সমাজের কোনো স্তরেই যদি জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণের চক্রান্ত চলে, তবে তাকেও কঠোরহ হাতে দমন করতে হবে।

 

রিপোর্টারঃ তপন মণ্ডল
 

Read more!
Advertisement
Advertisement