
রাজনীতি ও ক্রিকেট, যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও কিছু ঘটতে পারে! এই তো সে দিন বিদ্রোহী বিধায়কদের নিয়ে ক্ষমতার আস্ফালন দেখালেন। স্পষ্ট বাংলায় স্বভাবসিদ্ধ ভাবে বললেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে আমাদের দলের পরামর্শদাতা হিসেবে থাকতে পারেন।' পুজো মিটতেই তো খেলা ঘুরে যাচ্ছে! ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের একের পর এক বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করে দিলেন। কেউ কেউ আবার মমতাপন্থী বিধায়কের সঙ্গে দীর্ঘ মিটিংও সারলেন।
সন্দীপন ও কুণালের আধ ঘণ্টা ধরে বিজয়া সৌজন্য!
গত কয়েকদিনের কিছু ঘটনা নিয়ে একটু চর্চা করা যাক। প্রথম ঘটনা, বিধানসভার লবি। মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখ সন্দীপন সাহার দীর্ঘ আলাপচারিতা। দুজনেই দাবি করলেন, তাঁরা বিজয়ার সৌজন্য সাক্ষাত্ করেছেন। আধ ঘণ্টারও উপর সময় ধরে চলে সেই সৌজন্য বিনিময়। তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হতেই কুণাল বললেন, 'দু’জন বিধায়ক, পাশাপাশি কেন্দ্রের বিধায়ক, তাঁরা দেখা হলে রাজনীতির কথা হবে না?' একই সঙ্গে তিনি জানান, সন্দীপনের সঙ্গে তাঁর পুরনো পরিচয় রয়েছে। বিজয়ার পর দেখা হওয়ায় শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, এর বেশি কিছু নয়।
কুণাল যদিও বা 'রাজনীতি' শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করলেন, সন্দীপন তা-ও করেননি। স্বর্ণকমল সাহার ছেলের বক্তব্য, 'আপনারা এর মধ্যে রাজনীতি দেখতে চাইলে দেখতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক কোনও বিষয় নয়। পুরোটাই সৌজন্যমূলক।'
শোভনদেবের হাতে বিজয়ার মিষ্টি খেলেন কাজল
এ বার আসা যাক কাজল শেখের কথায়। বীরভূম জেলার বিধায়ক কাজল শেখ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা প্রিয় অনুব্রত মণ্ডলের ঝগড়া কে না জানে! ২০২৬ সালের রেজাল্টের পরে সেই কাজল ও অনুব্রত, দুজনেই চলে যান ঋতব্রতদের শিবিরে। একদা শত্রু, রাজনৈতিক বন্ধুতে পরিণত হন। সেই কাজল হঠাত্ পুজো মিটতেই বেসুরো। বিজয়ার মিষ্টি খাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু তারপরের ঘটনাপ্রবাহকে আর যাই হোক, স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। মমতা তৃণমূলের প্রবীণ নেতা বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে বিজয়ার মিষ্টিমুখ সারলেন কাজল শেখ। তারপরেই তাঁর দুই নিরাপত্তারক্ষী তুলে নিল নবান্ন। কাজলও নাছোড়বান্দা। সটান বলে দিলেন, 'বিজয়ার মিষ্টি খাওয়া যাবে না, সেটা জানতাম না। বিধানসভায় দেখা হবে না? সবার সঙ্গে সবারই দেখা হয়। আমি যদি বিজয়ার মিষ্টি খাওয়ার জন্য অপরাধ করি।তাহলে আবারও সেই অপরাধ করব।আমি চাইব আমার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমি কোনও ভাগের নেই।' তা হলে কি মমতা শিবিরে ফিরছেন? কাজলের জবাব, 'মমতাই আমার নেত্রী। আমি সর্বদা ওঁর দিকেই আছি।'
হামিদুল রহমান বলছেন, 'মমতার দল করি, ওঁর প্রতীকেই জিতেছি'
শোভনদেবের ঘরে কাজলের শুভেচ্ছা বিনিময় নিয়ে যখন বিধানসভার অন্দরে জল্পনা চলছে, তখনই বেসুরো হলেন ঋতব্রত শিবিরে নাম লেখানো আর এক বিধায়ক চোপড়ার হামিদুল রহমান। মমতাকেই নিজের নেত্রী বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন হামিদুল। জানিয়ে দেন, চাকুলিয়ার বিধায়কও তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। ঋতব্রত শিবিরে যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘যে দিন সই করেছিলাম, আলাদা দলের কোনও কথা হয়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, দিদির দলেই থাকব। বিরোধী দলের অফিসঘর নেওয়ার জন্য আমরা সই করেছিলাম। পরে শুনেছি অনেকে অনেক রকম কথা বলছেন। আমরা মমতার দল করি। ওঁর প্রতীকেই জিতেছি। ওঁকেই হাই-কমান্ড বলে মনে করি।’
এদিকে হামিদুলের এই কথা বলার পরেই বৃহস্পতিবার শুভেন্দু অধিকারী রায়গঞ্জের সভা থেকে সরাসরি তাঁকে নিশানা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পুরনো মামলাগুলির ফাইল খোলার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশকে। লুট হওয়া জমিও পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিলেন। শুভেন্দু অধিকারী বললেন, 'আমি এসপি, ইসলামপুরের ডিআইজি-কে বলে গেলাম, চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানের বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, ফের খোলা হবে। যত জমি লুট হয়েছে, সব উদ্ধার করা হবে। আমি দেখতে চাই, এই জেলায় কত বড় মস্তান আছে, কত বড় বালি চোর, ভুয়ো মাফিয়া রয়েছে।'
শিউলি সাহা নিজের এলাকায় কাজ করতে পারছেন না
কেশপুরের বিধায়ক শিউলি শাহাকে ঘিরেও নানা চর্চা কিন্তু চলছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের এই বিধায়কও কেঁদে ফেললেন। একদা মুকুল রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ শিউলি সাহা সদর্পে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ছেড়ে ঋতব্রত শিবিরে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি বললেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার নেত্রী। তাঁর প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তবে কালীঘাটে গিয়ে বিজয়ার প্রণাম করার পরিস্থিতি নেই। আমি আপনাদের মাধ্যমে প্রণাম জানাচ্ছি।' নিজের বিধানসভা এলাকায় গিয়ে কাজ করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন শিউলি। যদিও তিনি ঋতব্রত শিবির ছাড়ার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
ঋতব্রত শিবিরের ৩ বিধায়ক অনেক আগে থেকেই মমতার পাশে
এর আগে অগাস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হামলার প্রতিবাদে বিধানসভা চত্বরে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস। সেই প্রতিবাদে দেখা গিয়েছিল মেটিয়াবুরুজের বিধায়ক আব্দুল খালেক মোল্লা, বসিরহাটের বিধায়ক তৌসিফুর রহমান এবং বারুইপুর পূর্বের বিধায়ক বিভাস সর্দারকে। এঁরা তিনজনেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সে বার তৌসিফুর বলেছিলেন, 'যেখানে দিদি, সেখানে আমি। মমতাদির ছবি ছাড়া ৫০০ ভোটও পেতাম না। আমাদের ঋতব্রত শিবিরের তরফে বলা হয়েছিল, মমতাদি চেয়ারম্যান হবেন। কিন্তু আজ হবে, কাল হবে করে আর হয়নি।' বিভাস সর্দার বলেছিলেন, 'আমাদের নেত্রীর উপর আঘাত হয়েছে। তীব্র প্রতিবাদ করছি। মমতার প্রতীকে জিতেছি। তৃণমূলের ৮০ জনেরই এর প্রতিবাদ করা উচিত।'
মিনহাজ, মোশারফ, গোলাম রব্বানীদের গতিবিধি নিয়ে জল্পনা
গোলাম রব্বানী, মিনহাজ আফরিন, মোশারফ হোসেনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছেন। মিনহাজের কথায়, 'আমি শুরু থেকেই তৃণমূলে আছি। কংগ্রেস থেকে শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারা তৃণমূলে আসি। আমি দিদির সাথে আছি শুরু থেকে। আমি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আক্রমণ নিয়ে মিছিল করি। তবে বিরোধী দলনেতার জন্য আমি সই করেছিলাম। সই করলেও আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিকে। আমাদের বলা হয়েছিল, যা তা এখন আর মনে হচ্ছে না। আমি হলফনামা দিয়েছি দিদির পক্ষে। এলাকা থেকেও করে দিয়েছি।'
আমাদের শিবিরে এখন বিধায়ক সংখ্যা ২৭: শোভনদেব
বৃহস্পতিবার মমতা শিবিরের তরফে বিধানসভার দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ‘ভয়ঙ্কর অত্যাচার শুরু হয়েছ মমতাকে সমর্থন করা বিধায়কদের উপর। দু’জন মহিলা বিধায়ক এসে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ছেলেদের পুলিশ থানায় আটকে রেখে বলেছে, আগে গিয়ে ঋতব্রতদের লিস্টে সই করে এসো তা না হলে ছাড়া হবে না। ছেলেদের মামলা দিয়ে দেবে, অন্তত ছয়মাস জেলে থাকবে। ওঁদের সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন বিধায়ক পুজোর মধ্যে ও পরে যোগাযোগ করেছেন, সবাই চলে আসবেন বলেছেন। অনেকে চলে আসায় অঙ্কের হিসাবে আমাদের শিবিরে এখন বিধায়ক সংখ্যা ২৭ জন, অর্থাৎ তৃণমূলের জয়ীদের হিসাবে এক তৃতীয়াংশের বেশি হয়ে গিয়েছে।'
উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ আওড়াচ্ছেন ঋতব্রত
অতএব একের পর এক ঘটনাপ্রবাহ রাজ্য রাজনীতিতে অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিধায়কদের মূল ক্ষোভের জায়গা ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্তত মুখে এঁরা তা-ই বলেছিলেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি বারবার আস্থা দেখানোও চালিয়ে গিয়েছেন কয়েকজন। এই সব যখন ঘটছে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় উইলিয়ম উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ আওড়াচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। বৃহস্পতিবার রাতে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে অস্কার ওয়াইল্ডের একটি উক্তি পোস্ট করেন তিনি। সেখানে লেখা, “To live is the rarest thing in the world. Most people exist, that is all.” অর্থাৎ, 'পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বিরল বিষয়। অধিকাংশ মানুষ কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন।'